‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের ১০৫তম বার্ষিকী
কমলগঞ্জে চা শ্রমিক দিবস পালিত: আজও মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
উন্নত জীবনযাপনের সোনালী স্বপ্ন বুকে নিয়ে এক বুক আশা আর উদ্দীপনা নিয়ে নিজেদের আদি জন্মভূমি ছেড়ে এই বাংলার সবুজ পাহাড়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন একদল সরল মানুষ; কিন্তু চা বাগানে আসার পর বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে ঠেকে মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায় তাদের সেই রঙিন স্বপ্ন। দীর্ঘমেয়াদি শোষণ, বঞ্চনা ও ব্রিটিশদের অমানবিক দাসত্বের নির্মম চক্রে আটকেপড়া এসব ভাগ্যবিড়ম্বিত শ্রমিকের মনে একসময় তীব্রভাবে জেগে ওঠে নিজ জন্মভিটায় ফিরে যাওয়ার আকুল আকাঙ্ক্ষা এবং নিজেদের সেই পৈতৃক 'মুল্লুকে' ফেরার তীব্র ব্যাকুলতা থেকেই আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে জন্ম নিয়েছিল উপমহাদেশের ইতিহাসখ্যাত ও রক্তঝরা ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলন। ১৯২১ সালের ২০ মে চাঁদপুরের মেঘনা নদীর ঘাটে ব্রিটিশদের এক নির্মম ও রক্তাক্ত অধ্যায়ের মাধ্যমে চা শ্রমিকদের সেই স্বভূমিতে ফেরার স্বপ্নযাত্রা চিরতরে থেমে গেলেও, চা-শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের অধিকার, শোষণমুক্তি ও জাতিগত আত্মমর্যাদার লড়াইয়ের প্রধানতম প্রতীক হয়ে দিনটি আজও প্রতিবছর মাঠপর্যায়ে পালিত হচ্ছে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে। তবে দীর্ঘ সময় বদলালেও এবং দেশ স্বাধীনের পর উন্নয়নের এই আধুনিক স্বর্ণযুগে পৌঁছালেও আজো চা শ্রমিকদের জীবনের নির্মম ও রূঢ় বাস্তবতা বিন্দুমাত্র বদলায়নি; শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, ন্যায্য মজুরি ও মৌলিক মানবিক অধিকারসহ নানা ক্ষেত্রে এখনো এই স্বাধীন দেশে চরমভাবে পিছিয়ে রয়েছে চা-শ্রমিকদের এই বিশাল ও মেহনতি জনগোষ্ঠী।
ঐতিহাসিক ও রক্তস্নাত ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের ১০৫তম গৌরবময় বার্ষিকী উপলক্ষে আজ বুধবার (২০ মে) সকালে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মিরতিংগা চা বাগানের সাধারণ শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনের উদ্যোগে যথাযোগ্য মর্যাদায় গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়েছে চা শ্রমিক দিবস। আজ সকাল থেকেই মিরতিংগা চা বাগানের সর্বস্তরের শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজিত কর্মসূচির মধ্যে ছিল এক বিশাল ও বর্ণাঢ্য র্যালি এবং পরবর্তীতে বাগানের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে এক আলোচনা সভা। আলোচনা সভা শেষে চা-শ্রমিকদের ব্যাপক উপস্থিতিতে একটি বিশাল র্যালি বাগানের প্রধান প্রধান সড়ক ও আঁকাবাঁকা পথ প্রদক্ষিণ করে স্থানীয় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে এসে বীর শহিদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচির সফল সমাপ্তি ঘটায়। আলোচনা সভায় উপস্থিত শ্রমিক আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও বক্তারা অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস, ২০ মে’র ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং বর্তমান মুক্ত বাংলাদেশে চা-শ্রমিকদের ন্যায্য ও আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব বিশদভাবে তুলে ধরেন।
ইতিহাসের বিভিন্ন প্রামাণ্য তথ্য ও উপাত্ত থেকে জানা যায়, ১৯২১ সালের ২০ মে সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন বাগান থেকে একযোগে পালিয়ে আসা প্রায় ৩০ হাজার চা জনগোষ্ঠীর সদস্য নিজেদের জন্মভিটায় ফেরার লক্ষ্যে সিলেট থেকে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে চাঁদপুরের মেঘনা স্টিমার ঘাটে এসে পৌঁছান; কিন্তু তারা যখন জাহাজে চড়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে চান, তখন শোষক ব্রিটিশ মালিকদের নির্দেশে আসাম রাইফেলসের গোর্খা বাহিনীর নিষ্ঠুর সৈনিকরা অতর্কিতে চারপাশ থেকে ঘিরে এই অসহায় ও নিরস্ত্র চা শ্রমিকদের উপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হাজার হাজার শ্রমিককে হত্যা করে এবং তাদের রক্তাক্ত মরদেহ মেঘনা নদীর জলে ভাসিয়ে দেয়। ইতিহাসের সেই বর্বরোচিত ঘটনা থেকে যারা কোনোমতে অলৌকিকভাবে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে আবার বাগানে ফিরে এসেছিলেন, তাদেরকেও আন্দোলন করার চরম অপরাধে ব্রিটিশদের পাশবিক ও অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল; যার ফলে চা জনগোষ্ঠীর সদস্যরা শত চেষ্টা করেও আর কখনো পাননি তাদের নিজেদের প্রিয় স্বভূমির অধিকার। আর সেই নির্মম ও ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির পর থেকেই প্রতিবছর ২০ মে তারিখে নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত, শোষণ, বঞ্চনা ও তীব্র বৈষম্যের শিকার এদেশের চা শ্রমিকরা এটিকে পরম শ্রদ্ধায় ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছেন।
আরও জানা যায়, ১৮৫৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মালিনীছড়া চা বাগানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু করার পর বিশাল পাহাড় পরিষ্কার ও চা বাগান তৈরির জন্য ভারতের আসাম, উড়িষ্যা, বিহার, উত্তর প্রদেশ ও সাঁওতাল পরগনাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হতদরিদ্র মানুষদের একই ভূখণ্ডের জায়গায় স্থানান্তর করা হয়েছিল; সেই সময় ‘গাছ হিলেগা, রুপিয়া মিলেগা’ (অর্থাৎ চা গাছ নড়লেই টাকা মিলবে) এমন চরম লোভনীয় ও মিথ্যা প্রলোভনে সরল সোজা শ্রমিকদের এই জনপদে নিয়ে আসা হলেও, তাদের যে প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে সেই মারাত্মক ভুল বুঝতে তাদের বেশি সময় লাগেনি। বিশাল ও দুর্গম পাহাড়-জঙ্গল পরিষ্কার করে চা বাগান করতে গিয়ে হিংস্র বাঘ ও সাপের কবলে পড়ে হিসেবহীন কত হাজার হাজার চা-শ্রমিকের তাজা জীবন যে অকালে ঝরে গেছে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান আজো ইতিহাসে নেই; আর এর সাথে অব্যাহত ব্রিটিশ ও দেশি বাবুদের পাশবিক অত্যাচার তো ছিলই। পরবর্তীতে এই চরম নির্যাতনের প্রতিবাদে তৎকালীন চা-শ্রমিকদের অবিসংবাদিত নেতা পন্ডিত গঙ্গাচরণ দীক্ষিত ও পন্ডিত দেওসরন যৌথভাবে এই অবহেলিত শ্রমিকদের জাগিয়ে তুলে ‘মুল্লুকে চল’ বা মাতৃভূমিতে ফিরে যাবার ঐতিহাসিক আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন।
দীর্ঘদিন ধরে চা জনগোষ্ঠীদের অধিকার ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করা বিশিষ্ট গবেষক ও সমাজকর্মী বিশ্বজিত নন্দী এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা প্রতি বছরই অত্যন্ত জোরালোভাবে এই ঐতিহাসিক দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের ও সাধারণ ছুটি ঘোষণার আহ্বান জানিয়ে আসলেও, স্বাধীনতার এত বছর পরেও এ ব্যাপারে সরকারি কোনো দৃশ্যমান বা আন্তরিক উদ্যোগ আজও আমাদের চোখে পড়েনি; চা জনগোষ্ঠীদের যুগযুগ ধরে শুধু মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে এই দেশে আটকে রাখা হয়েছে এবং নামমাত্র স্বল্প মজুরির মাধ্যমে তাদের দিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রমের দাসত্ব করানো হচ্ছে।”
মিরতিংগা চা বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সম্মানিত সভাপতি মন্টু অলমিক অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, “আমরা দীর্ঘ বছর ধরে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ২০ মে-কে চা-শ্রমিক দিবস হিসেবে পালনের অফিসিয়াল স্বীকৃতি ও গেজেট চেয়ে আসছি, কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে আজ এই স্বাধীন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশেও আমাদের সেই যৌক্তিক দাবি উপেক্ষিত হয়েই রয়ে গেছে।”
চা-শ্রমিক ইউনিয়নের মনু ধলাই ভ্যালির সভাপতি ধনা বাউরি তাঁর সমাপনী বক্তব্যে বলেন, চা বাগানের লাখ লাখ সাধারণ শ্রমিকের ভাগ্যে আজও আধুনিক উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি; এমনকি রাষ্ট্রপ্রদত্ত মৌলিক মানবাধিকার ও নাগরিক সুবিধাগুলো ভোগ করার ন্যূনতম সুযোগ থেকেও আজো চা জনগোষ্ঠীর সদস্যরা বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। মিরতিংগা চা বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি মন্টু অলমিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ ও বিশাল আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন স্থানীয় প্রবীণ শ্রমিক নেতা সিরাজুল ইসলাম, মানিক প্রসাদ পালসহ বাগান পঞ্চায়েত ও ভ্যালির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: