জমকালো উদ্বোধনের পরদিনই উধাও সিলেটের ‘কৃষকের হাট’
Led Bottom Ad

কৃষি বিভাগের ‘বর্ষার খোঁড়া অজুহাত’

জমকালো উদ্বোধনের পরদিনই উধাও সিলেটের ‘কৃষকের হাট’

প্রথম সিলেট প্রতিবেদন

২০/০৫/২০২৬ ২০:২২:৪২

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

বাজারে অসাধু সিন্ডিকেট ও লোভী মধ্যস্বত্বভোগীদের অবৈধ দৌরাত্ম্য চিরতরে চূর্ণ করে প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য সরাসরি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সিলেটে অত্যন্ত ধুমধাম করে উদ্বোধন করা হয়েছিল বহুল আলোচিত ‘কৃষকের হাট’। স্বপ্ন ও মূল লক্ষ্য ছিল, কোনো ধরণের দালাল বা ফড়িয়াদের মধ্যস্থতা ছাড়াই গ্রামীণ চাষিরা সরাসরি সাধারণ ভোক্তাদের কাছে নিজেদের খেতের উৎপাদিত টাটকা পণ্য বিক্রি করবেন; এতে গ্রামীণ কৃষকরা যেমন সরাসরি আর্থিক লাভবান হতেন, ঠিক তেমনি শহরের সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষও প্রচলিত বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে খাঁটি ও বিষমুক্ত সবজি কেনার সুবর্ণ সুযোগ পেতেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার নির্মম ও রূঢ় চিত্র হলো, জমকালো ও ব্যয়বহুল উদ্বোধনের পর মাত্র একদিন কোনো রকমে চালু থাকার পরই রহস্যজনক কারণে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে কোটি টাকার এই মানবিক ও জনহিতকর উদ্যোগ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১১ এপ্রিল সিলেটের ব্যস্ততম টিলাগড় পয়েন্টে প্রথমবারের মতো এই বিশেষায়িত হাটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং উদ্বোধনের সময় সিলেট কৃষি বিভাগ থেকে বুক ফুলিয়ে অত্যন্ত জোরালো ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, এই হাটটি প্রতিদিন নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে বসবে। তবে জমকালো উদ্বোধনের পরপরই রহস্যজনকভাবে সুর বদলে তারা জানান, প্রতিদিন নয়, বরং সপ্তাহে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার এই হাট নির্দিষ্ট সময়ে বসানো হবে; কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে তার সম্পূর্ণ উল্টো ও হতাশাজনক চিত্র। উদ্বোধনের পরদিন মাত্র একবারের জন্য কিছু প্রান্তিক কৃষক পণ্য নিয়ে এসেছিলেন এবং স্থানীয় বাসিন্দা ও বাজারের সাধারণ ব্যবসায়ীদের তীব্র অভিযোগ—ওই একটি মাত্র দিনের পর গত এক মাসে আর কোনো দিন, কোনো সময়ের জন্যও সেখানে কোনো কৃষককে পণ্য বিক্রি করতে বা কোনো ক্রেতার সমাগম হতে দেখা যায়নি।

পুরো হাটের এমন চরম ব্যর্থতা ও হাহাকারের পরও সিলেট সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শওকত জামিল এক অদ্ভুত ও হাস্যকর দাবি করে সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, “হাটটি মোটেও বন্ধ হয়নি, এটি কাগজে-কলমে পুরোপুরি চালু রয়েছে!” তাঁর খোঁড়া দাবি, বর্তমানে তীব্র বর্ষা মৌসুম চলায় স্থানীয়ভাবে সবজি উৎপাদন নাকি কিছুটা কম, তাই কৃষকেরা হাটে আসছেন না এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নাকি হাট আবার পুরোদমে জমবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. শামসুজ্জামানও একই সুরে সুর মিলিয়ে একে ‘বর্ষার প্রভাব’ বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করে বলেছেন যে, আবহাওয়ার উন্নতি হলে কৃষকদের আবার হাটে ফিরিয়ে আনা হবে; তবে সরকারি কর্মকর্তাদের এই দাবিকে সস্তা অজুহাত আখ্যা দিয়ে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও পাইকাররা স্পষ্ট জানিয়েছেন, বর্ষা মৌসুমের বিষয়টি সরকারি কর্মকর্তাদের নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করার একটি সস্তা ও মনগড়া অজুহাত মাত্র; কারণ এই তীব্র বর্ষার মধ্যেও সিলেটের প্রতিটি গ্রামীণ ও পাইকারি বাজারে স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ টাটকা সবজি ও কৃষিপণ্য প্রতিদিন দেদারসে উঠছে এবং বিক্রি হচ্ছে। মূলত উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের ভেতরের চরম সমন্বয়হীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক অলসতা এবং একে অপরের ওপর দায় চাপানোর নোংরা আমলাতান্ত্রিক মানসিকতার কারণেই এই চমৎকার ও জনকল্যাণমুখী উদ্যোগটি অঙ্কুরেই ভেস্তে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

টিলাগড় সংলগ্ন সোনারপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হক আনহার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারি এই উদ্যোগটি দেখে আমরা সাধারণ ভোক্তারা ভীষণ আশাবাদী হয়েছিলাম যে সরাসরি কৃষকের হাত থেকে বিষমুক্ত টাটকা সবজি কম দামে কিনতে পারব, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে পুরো বিষয়টাই ছিল কেবলই কিছু কর্মকর্তার আইওয়াশ ও সস্তা প্রচারণার অংশ; কারণ আমি নিজে দু-একদিন শনি ও মঙ্গলবার গিয়ে শূন্য হাতে হতাশ হয়ে ফিরে এসেছি।” শাপলাবাগের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “বলা হয়েছিল শনি ও মঙ্গলবার হাট বসবে, কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে গিয়ে দেখি ফাঁকা শেড একা দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে কোনো মানুষ তো দূরের কথা, একটা সবজির পাতাও নেই।” এই চমৎকার প্রজেক্টটি এভাবে থমকে যাওয়ার ঘটনায় তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ ব্যক্ত করে সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, “কৃষকের হাটের মতো একটি দুর্দান্ত ও অত্যন্ত জনকল্যাণমুখী উদ্যোগ শুরু হতেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় থমকে যাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক, লজ্জাজনক ও হতাশাজনক একটি বিষয়; এখানে কৃষি বিভাগের উচিত ছিল কৃষকদের নিয়মিত যাতায়াত ও প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে পণ্য আনার বিষয়টি সরকারি পরিবহন সুবিধার মাধ্যমে নিশ্চিত করা।” তিনি আরও যোগ করেন, মাঠের বাস্তবচিত্র না দেখে এ রকম বর্ষার খোঁড়া অজুহাত না দিয়ে প্রশাসনের উচিত অনতিবিলম্বে সিন্ডিকেট ভেঙে এটি পুনরায় চালু করার জন্য দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবমুখী উদ্যোগ নেওয়া, অন্যথায় সরকারের এই ভালো উদ্যোগটির জন্য সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে।


এ রহমান

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad