‘চা শ্রমিক দিবস’-কে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও স্ববেতনে ছুটির দাবিতে সিলেটে বিক্ষোভ সমাবেশ
Led Bottom Ad

‘চা শ্রমিক দিবস’-কে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও স্ববেতনে ছুটির দাবিতে সিলেটে বিক্ষোভ সমাবেশ

প্রথম সিলেট প্রতিবেদন

২০/০৫/২০২৬ ২০:৪১:৪০

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

দীর্ঘ ১০৫ বছর আগের ঐতিহাসিক ও রক্তঝরা ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের বীর শহিদদের স্মরণে ২০ মে-কে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান এবং এই দিনটিতে দেশের সকল চা বাগানে শ্রমিকদের জন্য স্ববেতনে সাধারণ ছুটি ঘোষণার দীর্ঘদিনের পুরোনো ও যৌক্তিক দাবিটি এবার আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। এই ঐতিহাসিক দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন উপলক্ষে আজ বুধবার (২০ মে) সকালে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশন সিলেট জেলা শাখার উদ্যোগে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী লাক্কাতুড়া চা বাগানে বিশাল গণমিছিল, সমাবেশ ও শহিদ মিনারে পুস্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেছে সাধারণ চা শ্রমিকরা; এছাড়া একই দিনে সিলেটের তারাপুর চা বাগান, খাদিম চা বাগানসহ বিভাগের বিভিন্ন চা বাগানে শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে শ্রদ্ধাঞ্জলি ও মিছিল-সমাবেশের খবর পাওয়া গেছে। আজ বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় লাক্কাতুড়া চা বাগানের প্রধান শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয় এবং শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন শেষে বাগানের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে এক বিশাল শ্রমিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়; যেখানে শত শত চা শ্রমিক সমবেত হয়ে ২০ মে-কে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় গেজেটভুক্ত করাসহ ওই দিন স্ববেতনে বাধ্যতামূলক ছুটির জোর দাবি জানান।

সমাবেশে উপস্থিত প্রবীণ শ্রমিক নেতা ও মূল বক্তারা গভীর আবেগ ও ক্ষোভের সাথে ইতিহাসের পাতা স্মরণ করে বলেন, তৎকালীন ব্রিটিশ বাগান মালিকদের সীমাহীন প্রতারণা, বঞ্চনা ও দাসত্বসুলভ শোষণের বিরুদ্ধে ১৯২১ সালের ২০ মে আসামের চরাঞ্চলে গড়ে উঠেছিল এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক গণআন্দোলন, যা উপমহাদেশের ইতিহাসে 'মুল্লুক চলো' বা নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার আন্দোলন নামে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। সেই সময়ে কিংবদন্তি শ্রমিকনেতা পণ্ডিত গঙ্গা দয়াল দীক্ষিত, দেওশরন ত্রিপাঠী ও হরিচরণসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দের ডাকে সাড়া দিয়ে আসাম ও কাছাড় জেলার প্রায় ৩০ হাজার অসহায় চা শ্রমিক নিজেদের জন্মভিটায় ফেরার আকুলতায় করিমগঞ্জ রেল স্টেশনে সমবেত হন এবং সেখানে ব্রিটিশদের বাধায় রেল গাড়িতে উঠতে না পেরে জীবন বাজি রেখে মাইলের পর মাইল রেল লাইন ধরে পায়ে হেঁটে চাঁদপুর স্টিমারঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন; কিন্তু ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত সেই শ্রমিকরা যখন চাঁদপুর স্টিমারঘাটে পৌঁছান, তখন নিষ্ঠুর ব্রিটিশ মালিকদের প্রত্যক্ষ নির্দেশে আসাম রাইফেলসের গোর্খা রেজিমেন্টের সশস্ত্র বাহিনী এই সম্পূর্ণ নিরপরাধ ও অসহায় চা শ্রমিকদের উপর অতর্কিতে হামলে পড়ে এবং নির্বিচারে গুলি চালিয়ে এক নির্মম ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, ইতিহাসের সেই বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের তীব্র প্রতিবাদে সে সময় তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার রেলওয়ে এবং নৌযান শ্রমিকরাও একযোগে ঐতিহাসিক ধর্মঘট পালন করেছিলেন এবং চা শ্রমিকদের উপর ব্রিটিশদের এহেন পাশবিক নির্যাতনের প্রতিবাদেই পরবর্তীতে সমগ্র সর্বভারতীয় শ্রমিক আন্দোলনের এক নতুন ও শক্তিশালী পটভূমি রচিত হয়েছিল এই সোনার বাংলায়; তাই শত বছর ধরে চা শ্রমিকদের এই ঐতিহাসিক দিনটিকে আমরা আমাদের মুক্তির ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনের মূল স্মারক হিসেবে প্রতিবছর 'চা শ্রমিক দিবস' হিসাবে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে উদ্যাপন করে আসছি এবং অবিলম্বে এর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানাচ্ছি।

সমাবেশে বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বক্তারা অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শোষকদের এদেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৫ বছর পার হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত এই হতভাগ্য ও ভাগ্যবিড়ম্বিত চা শ্রমিকদের জীবন থেকে বঞ্চনা ও বৈষম্যের কালো মেঘ দূর হয়নি; আজো তাদের সন্তানদের জন্য শিক্ষা ও পরিবারের জন্য আধুনিক চিকিৎসার নূন্যতম কোনো সরকারি আয়োজন নেই এবং শত বছর ধরে এই মাটিতে রক্ত পানি করলেও আজো তাদের নিজেদের থাকার ভূমির কোনো স্থায়ী আইনগত মালিকানা দেওয়া হয়নি, যার ফলে রোগে-শোকে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর ঘটনা এই বাগানগুলোতে আজো নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামছাড়া ও ঊর্ধ্বগতির বাজারে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে শ্রমিক নেতারা বলেন, যেখানে বর্তমানে সরকারি শিল্পকারখানার একজন শ্রমিকের সর্বনিম্ন মজুরী ১৮ হাজার টাকার বেশি এবং খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকের একজন সাধারণ পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মাসিক সর্বনিম্ন মজুরী ২৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে একজন চা শ্রমিকের দৈনিক নগদ মজুরী মাত্র ১৮৭ টাকা—অর্থাৎ পুরো মাস হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে একজন শ্রমিক পান মাত্র ৫,৬১০ টাকা; এই আকাশছোঁয়া ও অমানবিক বৈষম্যই স্পষ্ট প্রমাণ করে যে এদেশের চা-শ্রমিকরা শুরু থেকে এখন পর্যন্ত পুঁজিপতি মালিক শ্রেণি এবং স্বয়ং রাষ্ট্রের চরম অবহেলা ও আধুনিক দাসত্বের শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

সমাবেশ থেকে শ্রমিক নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ২০ মে-কে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে স্ববেতনে সাধারণ ছুটি কার্যকর করা, বর্তমান বাজারদরের সাথে সংগতি রেখে দৈনিক নগদ মজুরি ন্যূনতম ৬শত টাকা নির্ধারণ করা, প্রতিটি চা বাগানে বাধ্যতামূলকভাবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয় নির্মাণ করা এবং চা জনগোষ্ঠীর জন্য স্থায়ী ভূমির অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা ও আধুনিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানান। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশন সিলেট জেলা শাখার সম্মানিত আহ্বায়ক হৃদয় লোহারের অত্যন্ত সুশৃঙ্খল সভাপতিত্বে ও পরিচালনায় অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) সিলেট জেলার অন্যতম প্রধান আহ্বায়ক আবু জাফর, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা প্রণব জ্যোতি পাল, সিলেট জেলা কমিটির নেত্রী জরিনা বেগম, শান্ত লোহার, আয়েশা বেগম, রত্না, দুর্জয় লোহার এবং সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের জেলা দপ্তর সম্পাদক মাহফুজ আহমদসহ স্থানীয় চা বাগানের পঞ্চায়েত নেতৃবৃন্দ।


এ রহমান

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad