বিলুপ্তির ঝুঁকিতে জীববৈচিত্র্য
সাতছড়িতে বাড়ছে বন্যপ্রাণী শিকারিদের তৎপরতা
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও এর আশেপাশের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আবারও বন্যপ্রাণী শিকারি চক্রের মারাত্মক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অত্যন্ত উদ্বেগজনক অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বন্যপ্রাণী প্রেমীদের দাবি, একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত ও দুর্ধর্ষ শিকারি চক্র দীর্ঘদিন ধরে মাধবপুর উপজেলার রঘুনন্দন বনের আওতাধীন শাহপুর ও জগদীশপুর বিট, তেলমাছড়া চিরহরিৎ বনাঞ্চল এবং সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বন্যপ্রাণী ও বিভিন্ন বিরল প্রজাতির পাখি নিধনে নির্বিঘ্নে সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রসমূহ জানায়, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন চন্ডীছড়া চা বাগান, শাহাজীবাজার রাবার বাগান, শাহপুর ও তেলমাছড়া বনাঞ্চলের গভীর জঙ্গলে শিকারি চক্রের হিংস্র সদস্যরা দিনে-দুপুরে মারাত্মক তীর-ধনুক ও ফাঁদ নিয়ে দেদারসে প্রবেশ করছে এবং বন্য শুকর, মায়া হরিণ, মেছো বাঘ, বনমোরগসহ অবাধে শিকার করছে নানা বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির বন্য পাখি; এমনকি তীর-ধনুকের আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত প্রাণীরা অনেক সময় গভীর জঙ্গলে পালিয়ে গিয়ে কোনো ধরণের চিকিৎসা না পেয়ে তীব্র যন্ত্রণায় ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। স্থানীয় পরিবেশবাদীদের গুরুতর অভিযোগ, সাতছড়ি ও এর আশেপাশে প্রতিনিয়ত শিকারিদের হামলায় আহত বন্যপ্রাণী উদ্ধার বা তাদের জরুরি চিকিৎসায় বন বিভাগের কোনো ধরনের আধুনিক ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এখানকার বন্য পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে।
এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার (১৯ মে) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মাধবপুর উপজেলা শাখার মৎস্য বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ আনিসুল আবদাল শাহ (লিটন) ব্যক্তিগতভাবে সাতছড়ি এলাকার চন্ডীছড়া চা বাগানে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটি সক্রিয় শিকারি দলের কাছাকাছি পৌঁছান এবং কৌশলে ওই দলে মিশে গিয়ে তাদের বন্যপ্রাণী শিকারের একটি চাঞ্চল্যকর ভিডিও চিত্র নিজের মুঠোফোনে ধারণ করেন। পরবর্তীতে সংবেদনশীল এই ভিডিওটি তিনি সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে প্রকাশ করলেও জনস্বার্থ, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কার্যক্রমের গোপনীয়তা ও শিকারিদের হিংস্রতার আশঙ্কার কথা বিবেচনা করে পরে তা ওয়াল থেকে মুছে ফেলেন। এই বিষয়ে মোহাম্মদ আনিসুল আবদাল শাহ (লিটন) গণমাধ্যমকে বলেন, “সাতছড়ির এই অপরূপ বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে স্থানীয় প্রশাসনের অত্যন্ত জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন এবং আমরা আমাদের দলীয় তথা রাজনৈতিক অবস্থান থেকেও পরিবেশ রক্ষায় খুব শীঘ্রই তৃণমূল পর্যায়ে কার্যকর সচেতনতামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করব।” বন্যপ্রাণী রক্ষা ও পাখিপ্রেমী সোসাইটির প্রধান স্বেচ্ছাসেবী শাহ আলম হৃদয় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই বিশাল পাহাড়ি বনাঞ্চলে বন্যপ্রাণী ও পাখি শিকারের ঘটনা এখন নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে; আমরা এর আগে একাধিকবার সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করলেও মাঠপর্যায়ে কোনো দৃশ্যমান বা কার্যকর আইনি ব্যবস্থা না থাকায় শিকারিরা কাউকেই পরোয়া করছে না।
হবিগঞ্জ বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা সাবরীনা ছায়ীদা শিমু বনাঞ্চলে শিকারি চক্রের অবাধ অনুপ্রবেশের সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, চোরাশিকারের খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থল ও স্থানীয় চা বাগানগুলোতে গিয়ে আদিবাসী ও চা শ্রমিকদের নিয়ে সচেতনতামূলক বিশেষ জরুরি সভা করেছি; কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, কিছু উগ্র চা শ্রমিক কোনোভাবেই শিকার বন্ধ করতে রাজি হয়নি, উল্টো তারা প্রকাশ্যেই দাবি করেছে যে—‘শিকার না করলে আমরা খাব কী’। এই দুর্ধর্ষ ও অনমনীয় আচরণের কারণে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের চিহ্নিত করে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা আরও জানান, মূলত তীব্র জনবল সংকট ও প্রয়োজনীয় যানবাহনের অভাবে গভীর বনে নিয়মিত টহল কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, আর এই প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই চতুর শিকারিরা বনের ভেতরে অপকর্ম চালাচ্ছে, তবে খুব শীঘ্রই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে সমগ্র সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবুল কালাম আজাদ এই বিষয়ে তাঁর কঠোর অবস্থানের কথা ব্যক্ত করে স্পষ্ট জানিয়েছেন, চা বাগান ও সাতছড়ির সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী শিকারের এই স্পর্শকাতর বিষয়টি ইতিমধ্যেই বন বিভাগের সর্বোচ্চ মহলের নজরে এসেছে এবং পুরো চক্রটিকে আইনের আওতায় আনতে স্থানীয় রেঞ্জ কর্মকর্তাদের নিবিড় তদন্তের পাশাপাশি চিরুনি অভিযান চালানোর কঠোর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: