বিশ্বনাথে প্রবাসীর শখের খামার এখন কোটি টাকার ‘মা এগ্রো ফার্ম’
সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় সম্পূর্ণ শখের বশে ঘরের মাত্র একটি গাভীর বাছুর দিয়ে গড়ে তোলা একটি ছোট পারিবারিক খামার এখন আধুনিক ও সফল রূপান্তরের মাধ্যমে রূপ নিয়েছে কোটি টাকার এক সুবিশাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। যুক্তরাজ্য প্রবাসী সফল তরুণ উদ্যোক্তা তাজ উদ্দিনের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বনাথ পৌরসভার হরিকলস গ্রামে অবস্থিত এই ‘মা এগ্রো ফার্ম’ থেকে বর্তমানে প্রতিবছর সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে নিট আয় হচ্ছে প্রায় ২০ লাখ টাকা। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা তথা কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে খামারটিতে সম্পূর্ণ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে পরম যত্নে প্রস্তুত করা হয়েছে বিভিন্ন আকর্ষণীয় আকারের উন্নত ক্রস-ব্রিড জাতের গবাদিপশু; যার মধ্যে দানবীয় আকৃতির তিনটি ‘সাইওয়ান ক্রস-ব্রিড’ জাতের ষাঁড় গরু স্থানীয় ক্রেতা ও সাধারণ মানুষের মাঝে বিশেষভাবে নজর কাড়ছে এবং খামার কর্তৃপক্ষের জোরালো দাবি—এর মধ্যে থাকা সবচেয়ে বড় কালো-রঙা ষাঁড়টিই হতে পারে এই বছর সমগ্র বিশ্বনাথ উপজেলার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও ওজোনদার কোরবানিযোগ্য পশু। সরেজমিনে হরিকলস গ্রামে অবস্থিত ‘মা এগ্রো ফার্ম’-এ গিয়ে দেখা যায়, আধুনিক এই খামারজুড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে ছোট-বড় বিভিন্ন আকর্ষণীয় জাতের গরু এবং কয়েকটি ক্রস-ব্রিড গরু আকারে পাহাড়সম ও অত্যন্ত আকর্ষণীয় হওয়ায় খামারে প্রতিদিন আগত পাইকার ও দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কেড়ে নিচ্ছে। বিশালাকার এই গরুগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা, গোসল ও স্বাস্থ্যের দিকে সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য তিনজন সুপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ খামার কর্মী নিয়মিত কাজ করছেন এবং কোনো ধরণের ক্ষতিকর স্টেরয়েড বা রাসায়নিক উপাদান ছাড়াই সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে নিজস্ব খামারের তৈরি সাইলেজ, গমের ভুসি, সরিষার খৈল ও পুষ্টিকর সবুজ ঘাস খাওয়ানোর পাশাপাশি খামারের ভেতরের সার্বিক পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখতে তারা দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন।
খামারের অভ্যন্তরীণ সূত্রসমূহ ও ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রায় আট বছর আগে নিছক ঘরের একটি গৃহপালিত গাভীর বাছুর লালন-পালনের মধ্য দিয়েই অত্যন্ত ছোট পরিসরে এই খামারটির ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল; পরবর্তীতে যুক্তরাজ্য প্রবাসী তাজ উদ্দিনের মূল আর্থিক ও আধুনিক দূরদর্শী উদ্যোগে শুরু হওয়া এই খামারটির মাঠপর্যায়ের সার্বিক দেখভাল ও পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তাঁরই আপন সহোদর সালা উদ্দিন। শুরুতে শুধু দেশি জাতের গরু দিয়ে খামার পরিচালনা করা হলেও বাজারে উন্নত জাতের গরুর ব্যাপক চাহিদা থাকায় পরবর্তীতে তাঁরা ক্রমান্বয়ে বিশ্বমানের উন্নত ক্রস-ব্রিড জাতের গরু পালনের দিকে ঝুঁকে পড়েন; যার ফলশ্রুতিতে বিশ্বনাথ উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সরাসরি কারিগরি সহযোগিতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরামর্শ ও আধুনিক খামার ব্যবস্থার ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বর্তমানে খামারটিতে অত্যন্ত লাভজনক ও বাণিজ্যিকভাবে গরু মোটাতাজাকরণ কার্যক্রম পুরোদমে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে এই দৃষ্টিনন্দন খামারে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩০টি বিভিন্ন মূল্যের ষাঁড় ও গাভী রয়েছে এবং এবারের আসন্ন কোরবানির ঈদে খামারটি থেকে উৎপাদিত পশু বিক্রি করে প্রায় কোটি টাকার ওপর কাঙ্ক্ষিত বেচাকেনা ও টার্নওভারের জোরালো আশা করছেন মালিকপক্ষ। এই বিষয়ে খামার পরিচালক সালা উদ্দিন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে গণমাধ্যমকে বলেন, “এবারের কোরবানির ঈদে আমাদের খামারে সমগ্র বিশ্বনাথ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও বড় আকারের গরু রয়েছে বলে আমরা নিশ্চিতভাবে ধারণা করছি এবং এই বড় গরুগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় সাইওয়ান ক্রস ষাঁড়টির বাজারমূল্য বা দাম ধরা হয়েছে ৬ লাখ টাকা, এছাড়া মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত ক্রেতাদের সুবিধার্থে বিভিন্ন দামের আরও আকর্ষণীয় গরু খামারে বিক্রির জন্য প্রস্তুত রয়েছে, তাই আমি সম্মানিত ক্রেতাসাধারণকে কোনো দালাল ছাড়াই সরাসরি খামারে এসে যাচাই-বাছাই করে গরুগুলো দেখার জন্য বিনীত আহ্বান জানাচ্ছি।”
উন্নত প্রযুক্তির এই খামারের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রবাসী মালিক তাজ উদ্দিন দূরপ্রবাস থেকে তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “আসলে পশুপালন ছোটবেলা থেকেই আমার অন্যরকম একটা শখ ছিল এবং সেই হৃদয়ের শখ ও ভালোবাসা থেকেই প্রবাসে থেকেও নিজ জন্মভূমিতে খামারটি শুরু করেছিলাম, আজ মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে এটি অনেক বড় বাণিজ্যিক পরিসরে পৌঁছেছে এবং আমার পরিকল্পনা রয়েছে ভবিষ্যতে এই খামারটিকে আরও আধুনিক ও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার।” বিশ্বনাথের ডেইরি খাতের এই অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক অগ্রগতি প্রসঙ্গে বিশ্বনাথ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুস শহীদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রথমদিকে এই প্রবাসী পরিবারটি সম্পূর্ণ দেশি জাতের গবাদিপশু দিয়ে খামারের সূচনা করলেও বর্তমানে তারা প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরামর্শে অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক উপায়ে উন্নত জাতের ক্রস-ব্রিড গরু সফলভাবে পালন করছেন। খামারে গরুর পুষ্টিমান নিশ্চিতকরণ, নিয়মিত টিকাদান, পরিচর্যা ও সার্বিক আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অত্যন্ত সন্তোষজনক ও প্রশংসনীয় উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে স্থানীয় বাজারে কৃত্রিম রাসায়নিকমুক্ত সুস্থ গরুর যে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, তাতে এই খামারটিতে অত্যন্ত চমৎকার ও লাভজনক বেচাকেনার এক বিশাল সুবর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে যা উপজেলার অন্য যুবকদেরও খামার গড়তে উদ্বুদ্ধ করবে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: