জীবন হাতে মাঝ-আকাশে: বিমানের অব্যবস্থাপনা ও এক প্রবাসীর আর্তনাদ
আমার আব্বা গুরুতর অসুস্থ থাকায় ২০১৬ সালে তিন বার দেশে যেতে হয়েছিল। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সাধারণত আমি বাংলাদেশ বিমানে যাই না খারাপ অভিজ্ঞতা থাকার কারণে, কিন্তু জরুরি প্রয়োজনে তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ বিমানেই যেতে হয়েছিল সেদিন।
২০১৬ সালের একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করার মধ্য দিয়ে মূল বিষয়বস্তুটি তোলে ধরতে চাই। বলে রাখা ভালো- ২০১৬ থেকে ২০২৬ এই দশ বছরে কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে, তা দশ বছর আগের নিম্নোক্ত লেখাটি পড়লেই বুঝতে পারবেন।
"তওবা করেছি, এই বিমানে আর কখনো পা দেব না।" কষ্টার্জিত টাকায় চড়া মূল্যের টিকিট কেটে নিজ দেশে ফেরার পর যখন একজন প্রবাসী এই চরম সিদ্ধান্ত নেন, তখন বুঝতে হবে জল কতদূর গড়িয়েছে। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের যে সম্মান পাবার কথা তাতো দূরের কথা বরং অহরহ হয়রানির শিকার এবং আমাদের বিমানবন্দর ও জাতীয় বিমান সংস্থা তাদের উপহার দিচ্ছে চরম আতঙ্ক, অপমান আর প্রাতিষ্ঠানিক অরাজকতা।
বছরের পর বছর ধরে চলা এই অব্যবস্থাপনা, জবাবহীনতা আর সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দেখে আজ মনে হতেই পারে যে দেশের এত বড় একটা সংবেদনশীল খাত কি তবে চোর-ডাকাতের আখড়ায় পরিণত হয়েছে? হিথ্রো থেকে ঢাকা রুটের একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে আমার নিজের অভিজ্ঞতা কেবল ভয়াবহ নয়, বরং জীবননাশের ঝুঁকির শামিল। মাঝ-আকাশে বারবার বেজে উঠছে ফায়ার অ্যালার্ম। পুরো বিমানের যাত্রীদের তখন জীবন সুতোয় ঝুলছে। অথচ ফ্লাইটের ক্রু মেম্বাররা কোনো এক অজ্ঞাত কারণে একে 'ল্যাভেটরিতে কেউ একজন সিগারেট খেয়েছে' বলে সস্তা অজুহাতে ধামাচাপা দেওয়ার চিরকালি মিথ্যে এবং ভুয়া চেষ্টা।
যদি সেটি বিমানের ইলেকট্রিক্যাল শর্ট-সার্কিট বা সেন্সর ফল্ট হয়ে থাকে, তবে তা যাত্রীদের কাছে গোপন করা অপরাধ। এখানেই শেষ নয়, মাঝপথে কয়েকবার লাইট সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া দেখে মনে হচ্ছিল মাঝ-আকাশে দেশের চিরচেনা 'বিদ্যুতের লুকোচুরি' খেলা চলছে, দীর্ঘ ৯-১০ ঘণ্টার এই দীর্ঘ রুটে এয়ার কন্ডিশন কাজ না করায় কেবিনের ভেতরের বাতাস হয়ে উঠেছিল দমবন্ধকর। আন্তর্জাতিক এভিয়েশন নিরাপত্তা আইনের এমন চরম লঙ্ঘন কোনো সভ্য দেশের বিমান সংস্থায় কল্পনাও করা যায় না, কিন্তু বাংলাদেশের?
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিপজ্জনক কারিগরি ত্রুটি ও ক্রুদের অবহেলা নিয়ে যখন যৌক্তিক প্রশ্ন করা হলো, বিমান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো সদুত্তর মেলেনি। উল্টো এক ধরণের উদাসীনতা ও অহংকার প্রকাশ পেয়েছে, যেন তারা কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করেন না। এমনকি বিমানের ভেতরের কিছু অসাধু কর্মী সাধারণ প্রবাসীদের আইনি অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে এমন বিভ্রান্তিকর তথ্যও ছড়ায় যে, হিথ্রোতে কমপ্লেইন করলেও নাকি বিমানের কিছুই হবে না, অথচ আন্তর্জাতিক এবং ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের মাটি থেকে ওড়া যেকোনো দেশের বিমান যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সেবা ত্রুটির জন্য বিশাল অঙ্কের জরিমানা দিতে শতভাগ বাধ্য। কিন্তু আমাদের দেশের যাত্রীরা ঝামেলার ভয়ে যুক্তরাজ্যের সিভিল এভিয়েশন এর মতো স্বাধীন বিচারিক সংস্থার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন না বলেই এই সিন্ডিকেট দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
আকাশ পথের এই আতঙ্ক যখন দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে নামে, তখন ভোগান্তির রূপ পাল্টে যায় কিন্তু তীব্রতা কমে না। বিমান থেকে নামার পর লাগেজ বেল্টের সামনে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের জন্য এক নিয়মিত নিয়তি। লাগেজ কেটে মালামাল চুরি হওয়া, মূল্যবান জিনিসপত্র গায়েব হওয়া এবং লাগেজ ছুড়ে ফেলে নষ্ট করার সিন্ডিকেট বছরের পর বছর ধরে বহাল তবিয়তে টিকে আছে। এখানে যিনি চুরির তদন্ত করছেন, দেখা যায় তার সহকর্মী বা নিচু স্তরের কর্মচারীরাই সেই চুরির মূল হোতা। অর্থাৎ, খুনি নিজেই যেখানে নিজের খুনের বিচারক, সেখানে সাধারণ মানুষ কার কাছে যাবে?
এই বিশৃঙ্খলা ও জবাবহীনতার মূল কারণ হলো স্বার্থের সংঘাত, বিচার হীনতার সংস্কৃতি, এবং বীমান সংস্থার কর্মচারীর উদত্বপৃর্ণ মনোভাব যা অধিকাংশ মানুষ কে হতাশ করে। তা ছাড়া ভোয়া পাইলট এমন একটা সংস্থায় কি করে চাকরি পায় ভাবলেই গা শিওরে ওঠ।
বিশ্বের যেকোনো উন্নত দেশে বিমানবন্দর পরিচালনার জন্য আলাদা স্বাধীন কর্তৃপক্ষ থাকে এবং নজরদারির জন্য থাকে পৃথক রেগুলেটরি বডি। কিন্তু বাংলাদেশে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ নিজেই লাইসেন্স দেয়, নিজেই বিমানবন্দর পরিচালনা করে, আবার নিজের কাজের তদারকি নিজেই করে! ফলে কোনো অপরাধ বা গাফিলতি হলে শাস্তি দেওয়ার বা জবাবদিহি চাওয়ার মতো কোনো স্বাধীন জায়গা দেশের ভেতরে থাকে না। এই চিরচেনা 'কে শুনে কার কথা' সংস্কৃতি ভাঙার সময় কখন আসবে? বিমান এবং বিমানবন্দর নিয়ে লেখা লেখি কম হয়নি কম হয়নি প্রতিবাদও। কিন্তু কর্তপক্ষ বা দেশের সরকারের কারো কোন কর্ণপাত নেই, যেন গন্ডারের চামড়ায় আচ্ছাদিত আইনের পোষাকে মোড়া একেকটা কুলাঙ্গার। কিন্তু কেন?
যতক্ষণ পর্যন্ত না এই খাতে স্বাধীন এভিয়েশন কমিশন গঠন করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রবাসীরা বিমানের টিকিট বর্জন করে অন্য আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের দিকেই ঝুঁকবেন। কারণ, দেশের টান যতই থাকুক, নিজের আত্মসম্মান আর জীবনকে তো আর এভাবে বাসের মতো লোকাল সার্ভিসের হাতে সঁপে দেওয়া যায় না!
লেখক : কবি ও কলাম লেখক
যুক্তরাজ্য প্রবাসী
ডিডি
মন্তব্য করুন: