শাল্লায় ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
‘জলে জয়ের যুদ্ধ, ডাঙ্গায় গণজোয়ার’
জলে তীব্র প্রতিযোগিতার রোমাঞ্চ আর ডাঙ্গায় হাজারো মানুষের উন্মাদনা—সুনামগঞ্জের আবহমান বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে শাল্লায় গড়ে উঠেছিল এক অভূতপূর্ব উৎসবের আমেজ। জলের চলাৎ চলাৎ শব্দ আর মাঝি-মাল্লাদের কণ্ঠের সুরেলা গানে পুরো হাওরজুড়ে এক স্বপ্নীল আবহ তৈরি হয়।
শনিবার (২২ আগস্ট) দুপুর ২টা থেকে শাল্লা উপজেলার কান্দিগাঁও গ্রামের হাওরে অত্যন্ত আনন্দঘন ও উদ্দীপনাময় পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় এই ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। কান্দিগাঁও (শান্তিনগর) গ্রামবাসী এবং হযরত ফয়তাব আলী শাহ্ (রহ.) ভক্ত সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই উৎসবে মেতে ওঠে গোটা এলাকা।
বাইচ চলাকালে হাওরের বাতাসে ভেসে আসে বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের কালজয়ী গানের সুর—‘কোন মেস্তরি নাও বানাইলো, কেমন দেখা যায়’। মাঝিদের জোরালো হাঁক-ডাক আর বৈঠার ছন্দে উত্তাল হয়ে ওঠে শান্ত হাওরের বুক। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ময়ূরপঙ্খীসহ নানা দৃষ্টিনন্দন ও সুসজ্জিত নৌকা নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামেন মাঝিরা। ইয়ারাবাদ, শান্তিনগর, নাছিরপুর ও গোয়ানী গ্রামসহ দূর-দূরান্তের উত্তাল প্রতিদ্বন্দ্বিতা উপভোগ করতে হাওরের চারপাশের তীরে আছড়ে পড়ে হাজারো উৎসুক দর্শকের ঢল।
শ্বাসরুদ্ধকর এই প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের সংসদ সদস্য নাছির উদ্দীন চৌধুরী। শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নাছির উদ্দীন চৌধুরীর সহধর্মিণী পারভীন আক্তার চৌধুরী, শাল্লা উপজেলা বিএনপির ১ম যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল আউয়াল, শাল্লা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সুহেল আহমদসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
প্রতিযোগিতায় অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে শান্তিনগর গ্রামের ফখরুল ইসলামের নৌকা। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে ইয়ারাবাদ গ্রামের মুহিত মিয়ার নৌকা এবং তৃতীয় স্থান পায় নাছিরপুর গ্রামের মাতাব আলীর নৌকা।
খেলা শেষে মূল আকর্ষণের ইতি টেনে প্রধান অতিথি প্রথম স্থান অধিকারী দলের হাতে ঐতিহ্যবাহী পুরস্কার হিসেবে একটি ঘোড়া তুলে দেন। এছাড়া দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দল দুটিকে উপহার দেওয়া হয় একটি করে খাসি। হারানো ঐতিহ্যের এমন বর্ণিল পুনরুজ্জীবনে পুরো শাল্লাজুড়ে এখন বইছে এক আনন্দ-উৎসবের মিষ্টি হাওয়া।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: