মৌলভীবাজারের চা-বাগানের সবুজ পথ পেরিয়ে হার্ভার্ডে শান্তা যাদব

মৌলভীবাজারের চা-বাগানের সবুজ পথ পেরিয়ে হার্ভার্ডে শান্তা যাদব

নিজস্ব প্রতিনিধি, কুলাউড়া

২২/০৮/২০২৬ ১৯:২১:২২

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার লংলা চা-বাগান। ভোরের কুয়াশা কাটতে না কাটতেই শুরু হয় চা-পাতা আর কুঁড়ি তোলার ব্যস্ততা। সবুজে ঘেরা এই বাগানের সৌন্দর্যের আড়ালে আছে শ্রম, অভাব, সীমিত সুযোগ আর প্রতিদিনের সংগ্রামের গল্প। সেই চা-বাগানেরই এক শ্রমিক পরিবারে জন্ম নেওয়া শান্তা যাদব আজ পৌঁছে গেছেন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের Master of Medical Sciences in Global Health Delivery (MMSc-GHD) প্রোগ্রামে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন শান্তা। জনস্বাস্থ্য বিষয়ে তাঁর এই উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পেয়েছেন প্রায় ২ কোটি টাকার বৃত্তি। চা-বাগানের একটি সাধারণ পরিবারের সন্তানের এমন অর্জন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি যেন লংলা চা-বাগান থেকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে যাওয়া এক স্বপ্নের গল্প।

শান্তার বাবা লক্ষীনারায়ণ যাদব এবং মা রিনা যাদব- দুজনই চা-বাগানের অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক। শ্রমজীবী এই পরিবারের আয় ও সুযোগ ছিল সীমিত। চা-বাগান এলাকার অনেক পরিবারের মতো তাঁদের জীবনেও ছিল নানা প্রতিকূলতা। কিন্তু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মেয়ের পড়াশোনার স্বপ্ন থামতে দেননি তাঁরা।

চা-বাগানের শিশু-কিশোরদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথ সাধারণত খুব সহজ নয়। পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণের অভাব, আর্থিক সংকট, উন্নত স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক প্রান্তিকতা তাদের পথকে আরও কঠিন করে তোলে। এমন পরিবেশে বেড়ে উঠে হার্ভার্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন অনেকের কাছেই হয়তো অকল্পনীয়।

শান্তার শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজে। এরপর তিনি ভর্তি হন চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন (AUW)-এ। সেখান থেকে তিনি পাবলিক হেলথে স্নাতক সম্পন্ন করেন। AUW-এ পড়াশোনার সময় জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা নিয়ে তাঁর ভাবনার পরিধি আরও বড় হয়। নিজের শৈশব ও বেড়ে ওঠার পরিবেশ থেকেই তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন—প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্য চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, আবার সেই সেবা পাওয়ার পথ কতটা কঠিন। এই অভিজ্ঞতাই তাঁর উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে নতুন লক্ষ্য দেয়।

দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়, মেধা ও পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে শান্তা যাদব পেয়েছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ। তাঁর পড়াশোনার জন্য প্রায় ২ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৃত্তি পাওয়ার খবর চা-বাগান সম্প্রদায়সহ পুরো কুলাউড়ার মানুষের জন্য এনে দিয়েছে আনন্দ ও গর্ব।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের Global Health Delivery বিষয়ে উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে তিনি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যবৈষম্য এবং পিছিয়ে থাকা মানুষের কাছে কার্যকর চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে আরও গভীর জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে চান।

লংলা চা-বাগান থেকে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল- দুটি জগতের দূরত্ব যেন অনেক। একদিকে চা-শ্রমিক পরিবারের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রাম, অন্যদিকে বিশ্বের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। কিন্তু শান্তা যাদব দেখিয়ে দিয়েছেন, এই দূরত্ব অতিক্রম করা অসম্ভব নয়।

একসময় লংলা চা-বাগানের সরু পথ ধরে স্কুল-কলেজে যাতায়াত করেছেন শান্তা। সেই পথের দুই পাশে ছিল চায়ের সবুজ পাতা, শ্রমজীবী মানুষের ব্যস্ততা আর জীবনসংগ্রামের অসংখ্য দৃশ্য। আজ সেই পথই যেন দীর্ঘ হতে হতে গিয়ে মিলেছে হার্ভার্ডের আঙিনায়। অভাব ছিল, প্রতিকূলতা ছিল, সুযোগ ছিল সীমিত- কিন্তু স্বপ্নের সীমা ছোট রাখেননি শান্তা যাদব।

তাঁর যাত্রা মনে করিয়ে দেয়- জন্ম কোথায়, পরিবার কতটা সচ্ছল কিংবা পথ কতটা কঠিন, সেটিই মানুষের ভবিষ্যতের শেষ কথা নয়। দৃঢ় লক্ষ্য, শিক্ষা, পরিশ্রম ও সুযোগকে কাজে লাগানোর সাহস থাকলে চা-বাগানের সবুজ পথও একদিন গিয়ে মিলতে পারে হার্ভার্ডের মতো বিশ্বসেরা বিদ্যাপীঠে।

শান্তা যাদবের এই অর্জন তাই একজন তরুণীর সাফল্যের গল্পের চেয়েও বড়- এটি স্বপ্ন দেখার সাহসের গল্প, প্রতিকূলতাকে জয় করার গল্প এবং বাংলাদেশের প্রান্তিক জনপদ থেকে বিশ্বমঞ্চে উঠে আসার এক অনুপ্রেরণাময় অধ্যায়।


নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad