পিচঢালা সড়কের কান্না, দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড?

পিচঢালা সড়কের কান্না, দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড?

অহিদ উদ্দীন

২৩/০৮/২০২৬ ০৩:৫৯:০২

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও পিচঢালা সড়ক রক্তাক্ত হচ্ছে, তাজা কিছু প্রাণ অকালেই ঝরে যাচ্ছে।আজ  ২২/০৮/২০২৬ একই রাস্তায় গত ৭/৮/২০২৬ তারিখেও ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনা ঘটে। যা আমাদের বারবার এই ভয়াবহ ও নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মৃত্যুর মিছিল কি শুধুই দুর্ঘটনা, নাকি এক প্রকার কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড? প্রতিদিনের এই ট্র্যাজেডির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কারণ হল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। দূর্ঘটনায় পতিত অসহায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর আইনি অধিকারের বিষয়টি নিয়ে এখন গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।


     বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংস্থার ডাটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ১৪ থেকে ২৫ জন মানুষ প্রাণ হারান। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আরও বড় আকারের জরিপ অনুযায়ী এই সংখ্যাটি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬৪ থেকে ৮৮ জন পর্যন্ত হতে পারে। এর চেয়েও ভীতিজনক বিষয় হলো, প্রতি বছর প্রায় ৮০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ মানুষ এই সড়ক সভ্যতার বলি হয়ে চিরস্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। এই পঙ্গুত্ব শুধু একজন মানুষের শারীরিক সক্ষমতাই কেড়ে নিচ্ছে না, বরং বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের মতে, প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে সরাসরি দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিয়ে চিরতরে পথে বসিয়ে দিচ্ছে। কি ভয়াবহ অবস্থা?


      পুলিশি গবেষণা অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনার মূল কারণ অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া ওভারটেকিং। এর সাথে যুক্ত হয়েছে লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রশিক্ষিত চালকদের হাতে স্টিয়ারিং থাকা। ব্রেইক ও লাইট নষ্ট থাকা। এতদসত্ত্বেও হাজার হাজার জরাজীর্ণ গাড়ি রাস্তায় চলছে। একই মহাসড়কে দ্রুতগতির বাসের সাথে ধীরগতির ইজিবাইক বা থ্রি-হুইলারের মিশ্র চলাচল এবং বিপজ্জনক বাঁকগুলো প্রতিনিয়ত মৃত্যুকূপ তৈরি করছে।


    দেশের সড়ক পরিবহন খাতের অভিভাবক হিসেবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ (BRTA) এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) এর তদারকির অভাব, দাপ্তরিক অনিয়ম এবং ভুয়া লাইসেন্স ও ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়ার সংস্কৃতিই অপরাধীদের রাস্তায় নামার লাইসেন্স করে দিচ্ছে, তাই এর প্রথম দায় এদের উপরই বর্তায়।


      সড়ক পরিবহন সেক্টরের মালিক শ্রমিক ইউনিয়নগুলো রাজনৈতিক ভাবে এতটাই প্রভাবশালী যে, হাইওয়ে বা ট্রাফিক পুলিশ অনেক সময় কঠোর আইন প্রয়োগ করতে গিয়েও থমকে যায়। ফলে চালকদের মনে সাজা পাওয়ার কোনো ভয় কাজ করে না।


     সাধারণ মানুষের মনে একটি গভীর ক্ষোভ ও বিশ্বাস জন্মেছে যে, থানায় গিয়ে বিচার পাওয়া যাবে না, উল্টো টাকা খরচ হবে। বাস্তব চিত্রও এই ধারণাকে সমর্থন করে। বাংলাদেশে মোট সড়ক দুর্ঘটনার তুলনায় দোষী চালকের চূড়ান্ত সাজার হার মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ। আদালতে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ৫ থেকে ১০ বছর, তদন্তে পুলিশের গাফিলতি, দুর্বল চার্জশিট এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য দিতে না চাওয়ার কারণে অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যায়। অন্যদিকে দুর্ঘটনার পরপরই শক্তিশালী পরিবহন সিন্ডিকেটের চাপ ও হুমকির মুখে অসহায় গরিব পরিবারগুলো সামান্য কিছু টাকা নিয়ে লোকাল আপস মীমাংসা করতে বাধ্য হয়। এছাড়া লাশের ময়নাতদন্ত নিয়ে সামাজিক ভীতিও মানুষকে মামলা করা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।


     এই বিচারহীনতা এবং আইনি জটিলতার বেড়াজালে যখন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে, তখন তাদের জন্য একটি বড় আইনি অধিকারের পথ তৈরি করেছে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮। এই আইনের অধীনে গঠিত বিআরটিএ আর্থিক সহায়তা তহবিল বা ট্রাস্ট ফান্ড সাধারণ মানুষকে কোনো প্রকার মামলা হামলার ঝামেলা ছাড়াই সরাসরি সরকারি আর্থিক সাহায্য পাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে যেমন মৃত্যুর ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির পরিবার এককালীন ৫,০০,০০০ (পাঁচ লাখ) টাকা। স্থায়ী পঙ্গুত্ব বা অঙ্গহানির ক্ষেত্রে চিকিৎসার জন্য ৩,০০,০০০ (তিন লাখ) টাকা। সামান্য আঘাতের ক্ষেত্রে চিকিৎসার খরচ বাবদ ১,০০,০০০ (এক লাখ) টাকা দেওয়া হয়।


     সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো, এই ফান্ডের সুবিধা পেতে হলে লাশের ময়নাতদন্ত করা বাধ্যতামূলক নয়। যদি হাসপাতালের রেজিস্টার্ড ডাক্তার বা সিভিল সার্জন সনদে লিখে দেন যে মৃত্যুটি দুর্ঘটনার আঘাতেই হয়েছে, এবং সাথে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলরের প্রত্যয়নপত্র থাকে, তবেই আবেদন করা সম্ভব। দুর্ঘটনা ঘটার ৯০ দিনের মধ্যে বিআরটিএ-র অফিশিয়াল ফরম নং-৩২ পূরণ করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার নথি ও থানার সাধারণ ডায়েরি GD নম্বরসহ আবেদন করলে সরকারি তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত এই অর্থ ক্ষতিগ্রস্তের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়।


     যদিও টাকা কখনোই একটি হারানো প্রাণ কিংবা চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাওয়া জীবনের বিকল্প হতে পারে না। তবে আকস্মিক বিপদে পড়া একটি পরিবার যেন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে না যায়, তার জন্য এই আইনি অধিকারগুলো সম্পর্কে সবার সচেতন হওয়া জরুরি। সড়ক বিভাগকে তাদের দুর্নীতি ও গাফিলতি ঝেড়ে ফেলে রাস্তায় শতভাগ কঠোর হতে হবে, আর সাধারণ নাগরিকদের জানতে হবে তাদের অধিকারের কথা। তবেই হয়তো একদিন আমাদের দেশের সড়কগুলো মৃত্যুর উপত্যকা থেকে নিরাপদ চত্বরে রূপ নেবে।


লেখক 

যুক্তরাজ্য প্রবাসী

কবি ও কলামিষ্ট

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad