নিয়োগপত্র নেই, তবুও হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ‘দ্বিতীয় ইউএনও’শাহীন!
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসেন, ইউএনও যান। কিন্তু হবিগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদে ১৩ বছর ধরে একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে টিকে আছেন শাহীনুর কামাল শাহীন। সরকারি কোনো পদে চাকরি করেন না, নিয়োগপত্রও নেই। অথচ দুটি সরকারি কোয়ার্টার দখল করে রাজকীয় বসবাস, সঙ্গে ব্যবহার করছেন ইউএনও কার্যালয়ের একটি কক্ষ। টেবিল-চেয়ার ও কম্পিউটার বসিয়ে নিজেকে বসিয়ে নিয়েছেন ‘দ্বিতীয় ইউএনও’ হিসেবে।
সরকারি নথিপত্রে না থাকলেও উপজেলার ওয়েবসাইটে তার পদ লেখা—‘উপজেলা আইসিটি টেকনিশিয়ান’। জেলা প্রশাসন জানে না এই পদের উৎস কী, কারণ পুরো হবিগঞ্জে এই পদের কোনো অস্তিত্বই নেই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, শাহীন যেন একাই এক প্রশাসন। দুটি সরকারি কোয়ার্টারের একটিতে পরিবার নিয়ে থাকেন, অন্যটিতে পার্ক করা থাকে তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ি। কিন্তু বছরের পর বছর বসবাস করলেও মেটাননি কোনো ভাড়া। পিডিবির তথ্যমতে, শুধু তাঁর বাসার বিদ্যুৎ বিলই বকেয়া পড়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। আর রান্নার গ্যাস জ্বলছে পাশের ইউএনও বাসভবনের সরকারি সংযোগ থেকে!
অভিযোগ রয়েছে, ইউএনওর নাম ভাঙিয়ে ও অফিসের ইউজার আইডি-পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, বয়স সংশোধন কিংবা নাম পরিবর্তনের একক 'সিন্ডিকেট' গড়ে তুলেছিলেন তিনি। সাধারণ সংশোধনে ২০০ থেকে হাজার টাকা, আর জটিল কাজ হলে ৩ থেকে ১৫ হাজার টাকা হাঁকাতেন শাহীন। এমনকি এনআইডি কার্ড বা বিভিন্ন সরকারি ভাতার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও এনেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
সরকারি চাকরি না করে কীভাবে দুই ট্রাক, দুই মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলের মালিক হলেন—এমন প্রশ্নে চোখ কপালে ওঠার জোগাড় স্থানীয়দের। অভিযোগ রয়েছে, গ্রাম পুলিশ নিয়োগ থেকে শুরু করে সমবায়, কৃষি ও সমাজসেবা দপ্তরের কার্ড বিতরণ—সব কিছুতেই ছড়ি ঘোরাতেন এই ‘ছায়া ক্ষমতার’ মালিক। গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পত্তি। অবৈধ উপার্জনের বড় একটি অংশ স্থানীয় প্রভাবশালীদের পেছনে ঢেলে নিজের 'ছত্রছায়াই' পাকা করতেন বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি পদে যোগ দিয়ে বর্তমান ইউএনও আবদুল্লাহ আবু জাহের বিষয়টি বুঝতে পেরে শাহীনকে মূল দাপ্তরিক কাজ ও ফাইলপত্র থেকে সরিয়ে দেন। তবে অফিস থেকে সরলেও দখল করা কোয়ার্টারে এখনও বহাল তবিয়তেই আছেন শাহীন।
জানতে চাইলে ইউএনও আবদুল্লাহ আবু জাহের বলেন, “তাঁকে দাপ্তরিক কাজ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই কোয়ার্টার খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
এদিকে নিজের বিরুদ্ধে আসা পাহাড়সম অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন করা হলে দম্ভের সুরেই শাহীনুর কামাল শাহীন বলেন, “আমি সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য নই। যা জানার ইউএনও সাহেবের কাছে গিয়ে শুনুন।”
এমন ‘দ্বিতীয় ইউএনও’র দৌরাত্ম্য বন্ধ করে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দখলদারি ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: