বড়লেখার আগর-আতর শিল্পে বিশ্ববাজারে বিপুল সম্ভাবনা

বড়লেখার আগর-আতর শিল্পে বিশ্ববাজারে বিপুল সম্ভাবনা

তাহির আহমদ

২২/০৮/২০২৬ ২২:৫১:৫৬

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

পাহাড়ঘেরা পাথারিয়ার পাদদেশে পা রাখলেই বাতাসে ভেসে আসে এক স্নিগ্ধ সুবাস। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সুজানগর যেন এক সুগন্ধির সাম্রাজ্য। শতবর্ষের ঐতিহ্য ও দক্ষ কারিগরদের ছোঁয়ায় এখানকার আগর ও আতর বিশ্বজুড়ে স্থান করে নিলেও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর অভাবে শিল্পটি কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না। বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক সুগন্ধির চাহিদা বাড়লেও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন ও নীতিসহায়তার ঘাটতিতে পিছিয়ে আছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা।

ব্রিটিশ আমলে পরিকল্পিতভাবে শুরু হওয়া এই শিল্প গত শতকের আশির দশকে এসে বাণিজ্যিক রূপ নেয়। বর্তমানে দেশের মোট আগর-আতরের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই উৎপাদিত হয় বড়লেখায়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ‘মৌলভীবাজারের আগর’ ও ‘মৌলভীবাজারের আগর আতর’ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক বাজারে দেশীয় সুগন্ধি ব্র্যান্ডিংয়ের নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব ও সার্টিফিকেশন না থাকায় এই স্বীকৃতির পূর্ণ সুফল মিলছে না।

আগরগাছের মূল সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে এর ভেতরের রজনসমৃদ্ধ কালচে অংশে, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘মাল’। পরিপক্ব গাছে কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক সংক্রমণের মাধ্যমে তৈরি হয় এই মূল্যবান অংশ। গাছ কেটে ছোট ছোট চিপস তৈরির পর তা থেকে পাতন প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত করা হয় মূল্যবান আগর তেল বা ‘উদ’। শুধু তেলই নয়, চিপস, গুঁড়া ও ধূপের উপাদান হিসেবেও ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

একটি আগরগাছ বাণিজ্যিকভাবে উপযোগী হতে ২৫ থেকে ৩০ বছর সময় লাগে। দোহালিয়াসহ বিভিন্ন গ্রামের শত শত কারিগর বছরের পর বছর ধরে নিভৃতে এই কাজ করে আসছেন। ‘পাছরানী’ নামে পরিচিত কাজটিতে যুক্ত শ্রমিকেরা সূক্ষ্ম হাতে রজন আলাদা করে বাজারজাত করেন।

বাংলাদেশ আগর অ্যান্ড আতর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কবির আহমেদ চৌধুরী জানান, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের ওপর ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছেন প্রায় দুই লাখ মানুষ। কিন্তু বিশাল এই খাতের জন্য এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি কোনো বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল বা বিশ্বমানের গবেষণা কেন্দ্র।

গোল্ডেন বাংলা পারফিউমের স্বত্বাধিকারী আবুল কাসেম বলেন, “আগর শিল্পের বিকাশে একটি বিশেষায়িত শিল্পপার্ক, মান নিয়ন্ত্রণ গবেষণাগার ও দক্ষ জনবল তৈরির কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি। ভেজাল প্রতিরোধ ও বৈশ্বিক বাজারের উপযুক্ত সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করা গেলে তৈরি পোশাকের পর এটিই হতে পারে দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত।”

বর্তমানে সুজানগর, দক্ষিণভাগ ও কাঠালতলী এলাকায় হাজারো উদ্যোক্তা কাজ করছেন। জামাল উদ্দিন নামের এক প্রবীণ চাষি জানান, আগে কৃত্রিমভাবে গাছে পেরেক মেরে সংক্রমণ ঘটানো হলেও এখন প্রাকৃতিকভাবে আক্রান্ত কাঠের চাহিদা বেশি। পাইকারেরা বাগান থেকেই গাছ কিনে নিয়ে প্রক্রিয়াজাতকারীদের কাছে পৌঁছে দেন।

তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং, আধুনিক প্যাকেজিং এবং নীতিগত জটিলতা নিরসন না হলে বাজার সম্প্রসারণ অসম্ভব। বৈশ্বিক বাজারে স্থান মজবুত করতে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ও জিআই স্বীকৃতির ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক নিবন্ধনের দিকে নজর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad