হবিগঞ্জে সুকময় এর গরম কড়াইয়ে ২ টাকায় স্বস্তি
চারপাশে যখন প্রতিনিয়ত বাড়ে বেঁচে থাকার দাম, চাল-ডাল আর আটার বাজারে যখন প্রতিনিয়ত নাভিশ্বাস উঠে সাধারণ মানুষের—ঠিক তখনই এক ফোঁটা অলৌকিক স্বস্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধ।
হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মোড়াকরি বাজার। বাজারের ছোট্ট গলিটায় হাঁটলে নাকে ভেসে আসে কড়াইতে ফুটতে থাকা গরম তেলের সোঁদা গন্ধ। ধোঁয়া ওঠা কড়াইয়ের সামনে আনমনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন প্রবীণ ব্যবসায়ী সুকময় দাস। তাঁর হাতে লালচে হয়ে ফুটে ওঠা মচমচে সিঙ্গারা, গরম পেঁয়াজু আর পুরি। দোকানে টাঙানো অদৃশ্য মূল্যতালিকায় সময় যেন থমকে আছে গত তিরিশ বছর আগের কোনো এক শান্ত বিকেলে—প্রতিটি নাস্তা মাত্র ২ টাকা!
যে যুগে একটা লজেন্সের দামও পাঁচ টাকা ছুয়েছে, যে যুগে হাতের মুঠোয় চাল-তেল কেনার সামর্থ্যটুকুও রোজ কমে আসে, সে যুগে সুকময় দাসের এই কড়াইটি শুধুই ব্যবসার দোকান নয়; যেন নিম্নবিত্তের খিদে মেটানোর এক নিভৃত আশ্রয়।
ময়দা, তেল, মশলার দাম আকাশ ছুঁয়েছে শতবার। কিন্তু সুকময়ের হাতের বানানে আর দামের মাপে এতটুকু চিড় ধরেনি। কেন বাড়ান না দাম? প্রশ্নের উত্তরে তাঁর সাদাসিধে মুখে শুধুই এক চিলতে নিশ্চিন্ত হাসি। হিসাব মিলিয়ে লাভ করার চেয়ে যে মানুষের হাসিমুখ দেখার আনন্দ অনেক বড়!
সকাল হতেই সুকময়ের কড়াই ঘিরে জমতে থাকে চেনা সব মুখ। রোদে পোড়া দিনমজুর, ভ্যান চালক, রিকশার হাতল ধরে ক্লান্ত হয়ে আসা প্রবীণ, কিংবা খালি পেটে স্কুলে ছোটা দামাল ছেলেমেয়েরা। পকেটে থাকা সামান্য দুটো খুচরো পয়সাতেই সুকময় তাঁদের হাতে তুলে দেন গরম-গরম খাবারের আত্মতৃপ্তি। সামান্য কয়েক টাকায় পেট ভরে ক্ষিদের জ্বালা মেটাতে পেরে তারা যে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, তাতেই যেন পূর্ণ হয়ে ওঠে সুকময়ের সমস্ত ক্লান্তি।
তিনি কোনো নামজাদা ব্যবসায়ী নন, সমাজের ওপরতলার কোনো বড় উদ্যোক্তাও নন। কিন্তু মোড়াকরি বাজারের ওই ফুটন্ত কড়াই আর ২ টাকার ভালোবাসা নিয়ে সুকময় দাস হয়ে উঠেছেন এক নিঃশব্দ ভালোবাসার কারিগর—যাঁর উনুনের আগুনে প্রতিদিন সেঁকা হয় মানবিকতার খাঁটি সোনা।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: