বনরক্ষী–স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
অবাধে গাছ নিধন : পরিবেশগত সংকটে রেমা-কালেঙ্গা ও সাতছড়ি বনাঞ্চল
দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক বনাঞ্চল হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রেমা-কালেঙ্গা ও সাতছড়ি আজ ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটে পড়েছে। একসময় যেখানে ছিল মূল্যবান বৃক্ষ ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের স্বর্গরাজ্য, সেখানে এখন নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। অব্যাহত গাছ পাচার ও বনদস্যুদের তাণ্ডবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে এই দুই সংরক্ষিত বনাঞ্চল।
১ হাজার ৭৯৫ হেক্টর আয়তনের সাতছড়ি বন ও ১৭ দশমিক ৯৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রেমা-কালেঙ্গা বনাঞ্চল দেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সম্পদ। এর মধ্যে রেমা-কালেঙ্গা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বনাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। তবে বছরের পর বছর ধরে চলা অবৈধ গাছ কাটার ফলে বনাঞ্চল দুটি আজ মারাত্মক হুমকির মুখে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ ডিসেম্বর গভীর রাতে একটি সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র কৌশলে সংরক্ষিত বনে প্রবেশ করে পরিকল্পিতভাবে তিনটি বড় সেগুন গাছ কেটে পাচার করে। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট বনরক্ষী সুমন বিশ্বাসকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। তবে ঘটনার আট দিন পেরিয়ে গেলেও চোরাই গাছ উদ্ধার করতে পারেনি বন বিভাগ। এতে দায়িত্বপ্রাপ্ত বনরক্ষীদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন টহলকর্মীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের দুঃসাহসিক চুরি সম্ভব নয়। একই সঙ্গে বন রক্ষায় নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, অনেক স্বেচ্ছাসেবক সামান্য বেতনের বিপরীতে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন ও অস্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। তাদের একটি অংশ গাছ পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বন বিভাগও স্বীকার করেছে, সম্প্রতি একটি শক্তিশালী ও সংগঠিত পাচারকারী চক্র আধুনিক যন্ত্রপাতি ও শক্ত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গভীর রাতে দ্রুত গাছ কেটে পাচার করছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রিজ মহাসড়কে বন বিভাগ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে বিপুল পরিমাণ চোরাই গাছসহ একটি ট্রাক জব্দ করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন শায়েস্তাগঞ্জের ফরেস্টার ও ডেপুটি রেঞ্জার আশিকুর রহমান। র্যাব-৩ এর শায়েস্তাগঞ্জ সিপিসি ক্যাম্পের একটি দল অভিযানে অংশ নেয়। এ সময় ট্রাকচালক ও হেলপারসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়। পরে ফরেস্টার বাদী হয়ে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করলে আদালতের মাধ্যমে অভিযুক্তদের কারাগারে পাঠানো হয়।
এর আগে গত ১১ ডিসেম্বর গভীর রাতে কালেঙ্গা বিটের নিশ্চিন্তপুর পাহাড় এলাকায় সেগুন গাছ কাটতে গিয়ে বনরক্ষীদের সঙ্গে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন সশস্ত্র পাচারকারীর ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। আধাঘণ্টার বেশি সময় ধরে বন্দুকযুদ্ধ চলার পর জনবল সংকটে বনরক্ষীরা পিছু হটতে বাধ্য হন। পরে বিজিবি ঘটনাস্থলে পৌঁছালে দস্যুরা পালিয়ে যায়।
সাতছড়ি বনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা নিজামুল হক বলেন, “কয়েক বছর ধরে সাতছড়িতে গাছ চুরির ঘটনা ছিল না। হঠাৎ করেই একটি চক্র সরকারি সম্পদ লুটে নিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এটা খুবই উদ্বেগজনক।”
স্থানীয় ফারুক মিয়া বলেন, “সীমিত জনবল দিয়ে বিশাল বনাঞ্চল রক্ষা করা কঠিন। এই সুযোগেই বনদস্যুরা আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে গাছ কেটে পাচার করছে। বন রক্ষায় স্বেচ্ছাসেবক ব্যবস্থার সংস্কার ও কঠোর নজরদারি জরুরি।”
এ বিষয়ে সাতছড়ি বিট কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, চুরি হওয়া সেগুন গাছ উদ্ধারে বন বিভাগ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বনরক্ষী সুমন বিশ্বাসকে শোকজ করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন।
রেমা-কালেঙ্গার ডেপুটি রেঞ্জার আব্দুল হাদী বলেন, “সীমিত জনবল নিয়ে এত বড় বনাঞ্চল রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন। তারপরও আমরা সাধ্যমতো দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি। বনদস্যুরা মাঝে মাঝেই আমাদের হুমকি দেয়।”
পরিবেশবিদ ও স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সংস্কার না হলে অল্প সময়ের মধ্যেই রেমা-কালেঙ্গা ও সাতছড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল সম্পূর্ণভাবে উজাড় হয়ে যেতে পারে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: