হবিগঞ্জে শিশু ধর্ষন : ঘটনা সত্য নাকি সাজানো ফাঁদ?

হবিগঞ্জে শিশু ধর্ষন : ঘটনা সত্য নাকি সাজানো ফাঁদ?

২৬/০৫/২০২৬ ১৩:১৬:১৯

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

দেশজুড়ে যখন শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো অপরাধ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ আর উদ্বেগ বিরাজ করছে, ঠিক তখনই হবিগঞ্জের এক প্রত্যন্ত গ্রামে শিশু ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলা ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম ধোঁয়াশা। অভিযোগের তীর আপন চাচাতো ভাইয়ের দিকে হলেও স্থানীয়দের দাবি ও সাক্ষীদের রহস্যজনক বক্তব্য—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, ঘটনাটি আসলেই নির্যাতন নাকি পারিবারিক সম্পত্তি বিরোধের জেরে পাতা এক নিষ্ঠুর ফাঁদ?


গত ২২ মে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় দুর্লভপুর গ্রামের সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন শিশুটির মা মনিরা চৌধুরী। মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে ২০ বছর বয়সী তরুণ বিজয় মিয়াকে। মামলার পর রাতেই পুলিশ বিজয়কে গ্রেপ্তার করে। তবে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে গিয়ে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার নেপথ্যে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র।


অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্ত বিজয় মিয়া ও ভিকটিম শিশু সম্পর্কে আপন চাচাতো ভাই-বোন। শিশুটির বাবা দীর্ঘদিন ধরে দুবাইয়ে রয়েছেন। দুই পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পৈতৃক জমি-জমা ও সম্পত্তি নিয়ে তীব্র বিরোধ চলছে।


অভিযুক্তের পরিবারের দাবি, ধর্ষণচেষ্টার কোনো ঘটনাই ঘটেনি। মূলত পারিবারিক বিরোধে প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে নিশ্চিহ্ন করতে ও এলাকাছাড়া করতেই ‘শিশু নির্যাতন’-এর মতো স্পর্শকাতর বিষয়কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে বাদীপক্ষ।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অভিযুক্ত ও ভিকটিমের এক নিকটাত্মীয় বলেন, “জায়গাজমি নিয়ে ঝামেলা দীর্ঘদিনের, এটা সবাই জানে। কিন্তু তাই বলে নিজের আপন ভাতিজার জীবন ধ্বংস করতে চাচি এমন ভয়ঙ্কর মামলার আশ্রয় নেবে, এটা আমরা ভাবতেও পারছি না।”


এই মামলার সবচেয়ে দুর্বল ও রহস্যজনক দিক হলো এর সাক্ষীদের বক্তব্য। মামলায় ভিকটিম শিশুর দাদিসহ চারজনকে সাক্ষী করা হয়েছে। কিন্তু মামলার গুরুত্বপূর্ণ দুই জন সাক্ষীই ঘটনার বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞতার কথা স্বীকার করেছেন।


দ্বিতীয় সাক্ষী ইয়ারচান ওরফে আলা বানু এবং তৃতীয় সাক্ষী আমীনা খাতুন স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁরা এ ধরনের কোনো ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। একজন বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “আমার নাম কীভাবে মামলায় সাক্ষীর তালিকায় গেল, সেটাই তো বুঝতে পারছি না। পুলিশ বা বাদীপক্ষ কেউ আমার সাথে কথাই বলেনি।”


আরও বড় রহস্য হলো, মামলায় ঘটনাস্থল দুর্লভপুর গ্রাম উল্লেখ করা হলেও, সাক্ষী করা হয়েছে মাইলের পর মাইল দূরের কাশিপুর ও শাহপুর গ্রামের বাসিন্দাদের। নিজ গ্রামের কাউকে সাক্ষী না রেখে দূরের মানুষকে সাক্ষী করায় মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে খোদ স্থানীয়দের মধ্যেই তীব্র কানাঘুষা চলছে।


দুর্লভপুর গ্রামের একাধিক বাসিন্দার সাথে কথা বলে জানা যায়, অভিযুক্ত বিজয় মিয়ার বিরুদ্ধে আগে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই। গ্রামবাসী এই অভিযোগকে ‘অবিশ্বাস্য’ ও ‘পরিকল্পিত নাটক’ বলে অভিহিত করছেন।


স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “জমি নিয়ে বিরোধের জেরে গ্রামে কত কিছুই তো হয়। কিন্তু ধর্ষণের মতো মিথ্যা মামলা দিয়ে একটা নিরীহ ছেলের জীবন ধ্বংস করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ঘটনা যদি সত্যি ১৫ তারিখে ঘটবে, তবে ২২ তারিখে কেন মামলা হবে?”


মামলার এজাহার অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে গত ১৫ মে সন্ধ্যা ৭টায়। অথচ মামলা করা হয়েছে তারও এক সপ্তাহ পর, ২২ মে। শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর ও সংবেদনশীল ঘটনায় সাধারণত কোনো পরিবার এক মুহূর্তও দেরি করে না। এখানে কেন দীর্ঘ সাত দিন সময় নেওয়া হলো, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।


বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে শিশুর মা মনিরা চৌধুরী বলেন, “প্রথমে পারিবারিকভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। সেখানে সমাধান না হওয়ায় পরে মামলা করেছি।”


তবে সচেতন মহলের মতে, এই বক্তব্যই প্রমাণ করে বিষয়টি নিয়ে ‘দরকষাকষি’র চেষ্টা হয়েছিল। কোনো ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা আপসযোগ্য হতে পারে না, ফলে দীর্ঘ সময় পর মামলার পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র থাকার সম্ভাবনাই বেশি।


আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু নির্যাতনের অভিযোগ অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এর সাথে একটি পরিবারের সম্মান ও একটি তরুণের ভবিষ্যৎ জড়িত। তাই কোনো পক্ষের অন্ধ আবেগ বা একতরফা বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে মেডিকেল রিপোর্ট, ফরেনসিক তথ্য এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করে পুলিশকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তদন্ত করতে হবে। কোনো পক্ষ যেন ক্ষমতার অপব্যবহার করে আইনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

স্বপন রবি দাশ / ডি আর ডি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad