দোয়ারাবাজারে স্ট্যাম্পে বেচাকেনা সরকারি জমি! বন্দোবস্তের আগেই দখলের মহোৎসব
সুনামগঞ্জের দোয়ারা বাজার উপজেলায় সরকারি ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত ভূমি বেআইনিভাবে বিক্রয় ও জোরপূর্বক দখলের পায়তারার অভিযোগ উঠেছে একদল প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। খাস জমি বন্দোবস্তের আবেদনকারী ও দীর্ঘদিনের ভোগদখলকার মোঃ আমির হোসেনকে তাড়িয়ে জমি দখলের চেষ্টা এবং বাধা দেওয়ায় তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের বাঁশতলা গ্রামের মৃত আজাদ মিয়ার ছেলে মোঃ আমির হোসেন বাঁশতলা মৌজার (জে.এল নং-০১, খতিয়ান নং-০১, এস.এ দাগ নং-৮১৮) ০.৫৮ একর বোরো শ্রেণীর সরকারি খাস জমি দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করে আসছেন। সরকারি বিধি মোতাবেক জমিটি বন্দোবস্ত পাওয়ার জন্য তিনি ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই দোয়ারা বাজার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে দরখাস্ত দাখিল করেন (যার ডকেট নং-১১৫৭)।
অভিযোগ উঠেছে, উক্ত জমি বন্দোবস্তের প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় আমির হোসেনের সহোদর ভাই আমির উদ্দীন ও ভাতিজা শফিকুল ইসলাম স্থানীয় বদরুল নামের এক ব্যক্তির সহযোগিতায় সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে একই এলাকার মাহমদ আলী (পিতা- মৃত তাহের আলী মোড়ল), আলী মিয়া, মজিবুর রহমান ও মান্নান (সর্ব পিতা- মৃত আউয়াল মিয়া) এর নিকট স্ট্যাম্প করে বিক্রি করে দেন।
পরবর্তীতে ক্রেতা দাবিদার মাহমদ আলী ও তাঁর লোকজন বহিরাগতদের সাথে নিয়ে উক্ত খাস জমি জোরপূর্বক দখল ও চাষাবাদের চেষ্টা চালান। সংবাদ পেয়ে আমির হোসেন স্থানীয় সাক্ষীদের নিয়ে বাধা দিলে প্রতিপক্ষরা ক্ষিপ্ত হয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং জমিতে গেলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি প্রদর্শন করে। গত ২৪ জুলাই সকালে ঘটনার জের ধরে স্থানীয় পাকা রাস্তায় প্রতিপক্ষরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমির হোসেনের ওপর হামলার চেষ্টা চালায় বলেও অভিযোগ করা হয়। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী আমির হোসেন সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসক এবং দোয়ারা বাজার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারী কার্যবিধির ১০৭/১১৭(সি) ধারায় প্রতিকার চেয়ে আবেদন করেছেন।
ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত জমি রাষ্ট্রের মালিকানাধীন সম্পদ। রাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তিবর্গ বা মধ্যস্বত্বভোগীর খাস জমি ক্রয় বিক্রয় বা হস্তান্তরের কোনো আইনি এখতিয়ার নেই। প্রচলিত আইন অনুযায়ী সরকারি জমি বেআইনিভাবে দখল, ভুয়া দলিল বা স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রি বা বিক্রির চেষ্টা করা একটি গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ।
দণ্ডবিধি (Penal Code) ও সরকারি সম্পত্তি প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী, অন্যের বা সরকারি সম্পত্তি প্রতারণামূলকভাবে নিজের দাবি করে বিক্রি বা হস্তান্তরের দায়ে দণ্ডবিধির ৪১৭/৪২০ ধারায় (প্রতারণা) এবং ৪৬৫/৪৭১ ধারায় (জালিয়াতি ও ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার) ২ বছর থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি সরকারি বা সর্বসাধারণের ব্যবহার্য ভূমি অবৈধভাবে দখল করলে, দখলের পায়তারা করলে কিংবা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে হস্তান্তর বা বিক্রয় করলে তা স্পষ্ট অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। উক্ত আইনের আওতায় অপরাধীদের সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম বা সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী মোঃ আমির হোসেন বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে এই সরকারি জমি চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করছি এবং নিয়ম মেনে বন্দোবস্তের আবেদন করেছি। অথচ একটি প্রতারক চক্র অবৈধ টাকার বিনিময়ে সরকারি জমি বিক্রি করে আমাকে ভূমিহীন করার চক্রান্ত করছে। বাধা দেওয়ায় এখন পরিবারসহ প্রাণের ঝুঁকিতে আছি।
এদিকে সরকারি খাস জমি ক্রয়ের বিষয়ে বিবাদী মোঃ মুজিবুর রহমান বলেন, এলাকার মুরুব্বিদের সামনে রেখে আমির হোসেনের মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সময় আমার কাছে উনার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম এক কিয়ার জমি এবং আমির উদ্দিনের ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর জন্য তিন কিয়ার জমি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রি করেছেন। স্ট্যাম্পের মাধ্যমে সরকারি খাস জমি ক্রয়-বিক্রয় আইনসম্মত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, আমাদের এলাকায় এভাবেই সরকারি জমি ভোগদখলদাররা স্ট্যাম্পের মাধ্যমে অন্য জনের কাছে হস্তান্তর করে থাকে।
তবে জমি বিক্রির এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন আমির হোসেনের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, আমি কোনো জমি বিক্রি করিনি। এই জমি আমরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করে আসছি। এখন তারা ভুয়া দলিল ও স্ট্যাম্প দেখিয়ে বলে আমরা নাকি জমি বিক্রি করেছি! আমরা জমিতে চাষের জন্য গেলে তারা আমাদের খুন করার হুমকি দেয়। আমরা ভূমিহীন মানুষ, তারা জোরদখল করে এই জমি ভোগ করতে চায়। আমরা প্রশাসনের কাছে এর সঠিক বিচার চাই।
উভয় পক্ষের এই বিরোধ ও আবেদনের বিষয়ে দোয়ারাবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ তরিকুল ইসলাম জানান, পুলিশ সুপার মহোদয়ের কাছ থেকে একটি দরখাস্ত পেয়েছি, যা আমির হোসেন দাখিল করেছিলেন। তিনি কিছু খাস জায়গা বন্দোবস্তের জন্য আবেদন করেছিলেন, তবে এখনো বন্দোবস্ত পাননি। উক্ত জায়গায় অন্য কয়েকজন দখল করে ধান রোপণ করছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা সাথে সাথে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠাই। প্রাথমিকভাবে তদন্ত করে জানা যায়, আমির হোসেনের ভাই ছয় কিয়ারের মধ্যে তিন কিয়ার এবং স্ত্রী এক কিয়ার জমি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রি করেছেন বলে অপর পক্ষ দাবি করছে। সেই অনুযায়ী মুজিবুর রহমান ৪ কিয়ার জমিতে ধান রোপণ করেছেন এবং ২ কিয়ার জমি আমির হোসেনের নিয়ন্ত্রণে আছে। জমিটির বন্দোবস্তের বিষয়ে আমরা উপজেলা ভূমি প্রশাসনের কাছে তথ্য চাইব। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রীতম দাস/ ডিডি
মন্তব্য করুন: