ভালোবাসার চার দশক পেরিয়ে মৌলভীবাজারে দিদিমনির রাজকীয় বিদায়!
দীর্ঘ ৩৯ বছর ৪ মাস ধরে হাজারো শিশুর হৃদয়ে আলোর প্রদীপ জেলে শেষ পর্যন্ত অবসরে গেলেন প্রিয় শিক্ষিকা বেলা রানী দেব। কর্মজীবনের শেষ দিনে তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনে কোনো ত্রুটি রাখেননি তাঁরই গড়ে তোলা কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা। পুষ্পবৃষ্টি, করতালির উষ্ণতা আর সুসজ্জিত রাজকীয় ঘোড়ার গাড়িতে চেপে প্রিয় বিদায়যাত্রায় উত্তর নন্দীউড়া গ্রামের নিজ বাড়িতে পৌঁছালেন এই শিক্ষাগুরু।
গত সোমবার বিকেলে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত হয় এই আবেগঘন বিদায় সংবর্ধনা।
জানাগেছে, ১৯৮৭ সালে বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন বেলা রানী দেব। কর্মজীবনের পুরো চারটি দশক তিনি পার করেছেন এই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই। তাঁর কাছে বর্ণমালা চেনা ও হাতেখড়ি নেওয়া বহু শিক্ষার্থী আজ দেশ-বিদেশে স্ব-মহিমায় প্রতিষ্ঠিত।
সোমবার দুপুরে মুষলধারে বৃষ্টির কারণে বিদ্যালয়ের মাঠ কর্দমাক্ত হয়ে পড়লেও প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের আবেগ-উদ্দীপনায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। বেলা রানী দেব যখন বিদায়মঞ্চে উপস্থিত হন, তখন পুরো প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের করতালিতে। সাবেক ও বর্তমান ছাত্রছাত্রীরা তাঁদের প্রিয় 'দিদিমণি'কে ফুল ও স্মারক উপহারে সিক্ত করেন।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে প্রিয় শিক্ষককে রকিং চেয়ারে বসিয়ে শূন্যে ভাসিয়ে নিয়ে সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে তুলেন। এরপর বর্ণাঢ্য মোটরসাইকেলের বহর ও শতাধিক শিক্ষার্থীর শোভাযাত্রা নিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে তাঁকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গৌরাঙ্গ চন্দ্র ধরের সভাপতিত্বে বিদায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল শিকদার। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল জলিল তালুকদার। এছাড়া প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পক্ষে স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য দেন লেখক মহিদুর রহমান ও তুহিন জুবায়ের।
বিদায়বেলায় প্রিয় শিক্ষার্থীদের এমন অভূতপূর্ব ভালোবাসায় আবেগে আপ্লুত হয়ে অশ্রুসিক্ত হন বেলা রানী দেব। অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমার অনেক ছাত্রছাত্রী আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তারা যে আমাকে এতটা ভালোবাসে, তা এভাবে না দেখলে বুঝতাম না। এই স্কুলটি আমার নিজের পরিবারের মতো ছিল। আজকের এই সম্মান ও ভালোবাসার অনুভূতি আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।”
আয়োজক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী তুহিন জুবায়ের বলেন, “আমরা শৈশব থেকেই তাঁকে দিদিমণি বলে ডেকে এসেছি। তিনি আমাদের শুধু পাঠদান করেননি, মায়ের মতো আগলে রেখেছেন। আমাদের পরিবারের বড় ভাইদের থেকে শুরু করে ছোটরা পর্যন্ত সবাই তাঁর স্নেহচ্ছায়ায় বড় হয়েছেন। তাঁর এই দীর্ঘ নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও পরিশ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই আমাদের এই সামান্য আয়োজন।”
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: