পবিত্র ১২ই রবিউল আউয়াল
সুন্নাহর পথে নতুন শপথের দিন আজ
কালের আবর্তে পরিক্রমায় আবার আমাদের হৃদয়ে রহমতের সুবাতাস নিয়ে ফিরে এলো পবিত্র ১২ই রবিউল আউয়াল—বিশ্বমানবতার চিরন্তন মুক্তির দিশারী, সায়্যিদুল মুরসালিন মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মোবারক ধরাধ্যামে আগমন ও ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত এক পুণ্যময় দিন।
মানবজাতির সুসংবাদ ও হেদায়েতের জন্য একচ্ছত্র ও সর্বোত্তম আদর্শ হচ্ছেন প্রিয় নবী রাসুলুল্লাহ (সা.)। কালামুল্লাহ শরিফে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বয়ং আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন—নবীজীর জীবনই মানুষের জন্য সর্বোত্তম অনুকরণীয় পথ। বিশ্বনবী (সা.) নিজেও ঘোষণা করেছেন, “আমি তো শিক্ষক হিসেবেই প্রেরিত হয়েছি।” তাঁর দেখিয়ে যাওয়া আলোর পথ ছাড়া মুমিনের অন্য কোনো আদর্শে মন সঁপে দেওয়ার সুযোগ নেই; অন্য কোনো দর্শনে মানবজাতির প্রকৃত কল্যাণও নিহিত নেই।
শৈশবের মাসুমিয়াত থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ জীবন—ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনের প্রতিটি স্তরে তিনি এক অতুলনীয় পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা রেখে গেছেন। প্রিয় নবীজীর অনুসরনে কেবল মুসলিম উম্মাহর আখেরাতের নাজাতই লুকিয়ে নেই, বরং জগতের যেকোনো মানুষ তাঁর সুন্নাহর সুবাসিত নীতি গ্রহণ করলে দুনিয়াবী জীবনেও চূড়ান্ত সফলতা লাভ করতে বাধ্য। তাই তো পবিত্র ১২ই রবিউল আউয়াল কেবল মুসলমানদের জন্য নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব মানবতার চরম সৌভাগ্য ও তাৎপর্যময় এক মাহেন্দ্রক্ষণ।
এই পবিত্র দিনে প্রতিটি মোমিন হৃদয় প্রিয় নবীজীর জীবন-আলোয় নিজেদের নতুন করে গড়ে তোলার অপার্থিব তাগিদ অনুভব করে। স্মরণ পড়ে যায় মহানবীর আগমনের পূর্বে তমসায় ঘেরা সেই জাহেলিয়াতের করুণ যুগের কথা, যখন মানবসমাজ চরম নিষ্ঠুরতা, বৈষম্য ও বর্বরতার যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল। নবীজীর রহমতের পরশে আর ঐশী আদর্শের সুবাতাসে কীভাবে সেই অন্ধকার ঘেরা সমাজ এক শান্তিময় আলোর উদ্যানে পরিণত হয়েছিল, এই দিনে সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহ গভীর ভাবাবেগে তা স্মরণ করে।
আজকের কলুষিত ও অশান্ত পৃথিবীতেও সকল অন্যায়, অস্থিরতা ও অনৈক্য থেকে নিজ দেশ, সমাজ ও পরিবারকে রক্ষা করতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহই আমাদের একমাত্র আশ্রয়। প্রিয় নবীজি এবং তাঁর ত্যাগী, নিবেদিতপ্রাণ সাহাবায়ে কেরামের সুমহান চরিত্র থেকে শিক্ষা নিয়ে আজ আমাদের আত্মশুদ্ধি ও দ্বীনের ওপর অবিচল থাকার নতুন শপথ নিতে হবে। বিগত দেড় হাজার বছর ধরে অগণিত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও উম্মাতে মুহাম্মাদী এভাবেই রাসুলপ্রেম ও ইসলামের এই অটুট রশিকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
আমাদের আকাসুন্দরা স্মরণ করিয়ে দেন, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন— “যতক্ষণ তোমরা আল্লাহর কালাম (কোরআন) এবং আমার সুন্নাহকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততক্ষণ তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না।”
অথচ আফসোস! বর্তমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মুসলিম সমাজে যে চরম অস্থিরতা ও অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে, তার প্রধান কারণ আমরা আজ নবীজীর আদর্শকে খণ্ডিতভাবে গ্রহণ করেছি। ইসলামের সৌন্দর্যকে পূর্ণাঙ্গভাবে ধারণ না করার কারণে নিজেদের মুসলিম দাবি করেও বহু মানুষ আজ ইসলাম ও উম্মাহর ক্ষতি সাধন করে চলেছে। ফলে ইনসাফভিত্তিক ও অপরাধমুক্ত কোনো সুশীল সমাজ গড়ে উঠছে না। তার ওপর যোগ হয়েছে পশ্চিমা বস্তুবাদী, ভোগবাদী সংস্কৃতি ও শাসন ব্যবস্থার নেতিবাচক প্রভাব।
আমরা অনেকেই আংশিক আমল করেই মনে করি পূর্ণাঙ্গ ঈমানদার হয়ে গেছি। বর্তমান বিশ্বের চরম ব্যর্থতা ও হতাশা দেখে আজ সময় এসেছে হৃদয়ে গভীর আত্মজিজ্ঞাসা জাগিয়ে তোলার। খণ্ডিত চর্চা থেকে বেরিয়ে এসে জীবনকে মহানবী (সা.)-এর পরিপূর্ণ সুন্নাহ ও আদর্শের ছাঁচে ঢেলে সাজানোই আজকের সবচেয়ে বড় তাগিদ।
ঈদে মিলাদুন্নবীর এই নূরাফশাঁ দিনে আসুন, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি অন্তরের অতল গভীর থেকে ভালোবাসার নজরানা পেশ করি এবং তাঁর প্রতিটি সুন্নাহকে জীবনে বাস্তবায়ন করার জন্য দৃঢ় অঙ্গীকার ও পুনর্শপথ গ্রহণ করি। মহান আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন। আমিন।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: