বালাগঞ্জে শিক্ষা কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়
সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান ও এক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, শিক্ষক হয়রানি, অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়ে তদন্ত ও প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে আলাদা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এক সহকারী শিক্ষিকা, স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষা কমিটির সাবেক এক প্রতিনিধি।
লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্যমতে, বালাগঞ্জের পশ্চিম গৌরীনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলেকা বেগম এবং সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসানের অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে গত সোমবার (২৪ আগস্ট) সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দুটি পৃথক আবেদন জমা দেওয়া হয়। এর আগে গত ৩০ জুলাই একই বিদ্যালয়ে অনিয়মের অভিযোগে ইউএনওর কাছে লিখিত দাবি জানান অভিভাবকেরা।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দেওয়া অভিযোগে পশ্চিম গৌরীনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সালমা সুলতানা উল্লেখ করেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলেকা বেগম বিদ্যালয় পরিচালনায় নানা অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ করছেন। অভিভাবকদের সঙ্গে দুব্যবহার, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দিয়ে ঝোপঝাড় থেকে শাক-লতাপাতা তোলানো এবং পুরোনো ভবনের আসবাবপত্র গোপনে বিক্রি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনেন তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান যোগসাজশ করে প্রকৃত অভিভাবক ও দাতা সদস্যদের বাদ দিয়ে নিজেদের পছন্দের লোক দিয়ে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করেছিলেন। এতে বাধা দেওয়ায় শিক্ষিকা সালমা সুলতানাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে অভিভাবক ও দাতা সদস্যদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ইউএনওর হস্তক্ষেপে সেই বিতর্কিত কমিটি স্থগিত করা হয়। সালমা সুলতানা তাঁর আবেদনে নির্ভয়ে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
একই দিন মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও সিন্ডিকেট গঠনের অভিযোগ এনে পৃথক আবেদন করেন উপজেলা শিক্ষা কমিটির সাবেক প্রতিনিধি কুলসুমা বেগম। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা একটি নিজস্ব ‘বলয়’ তৈরি করে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা বণ্টন ও বিদ্যালয় তদারকি করছেন। এ নিয়ে মুখ খুললে বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানালে শিক্ষকদের ভয়ভীতি ও পরিণতির হুমকি দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলার একাধিক শিক্ষক জানান, কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান নিজেই সময়মতো অফিসে উপস্থিত থাকেন না। বদলি বা প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তির ভয়ে শিক্ষকেরা তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি মুখ খুলতে সাহস পান না।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলেকা বেগম। তিনি বলেন, “অভিযোগকারী শিক্ষক আমার জুনিয়র। চার বছর আগে তাঁকে দায়িত্ব নিতে বলা হলেও তিনি নেননি, তাই আমাকে নিতে হয়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব বলা হচ্ছে। আমি আমার বক্তব্য কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানাব।” তবে শিক্ষার্থীদের দিয়ে শাক-লতাপাতা তোলানো কিংবা আসবাব বিক্রির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
অভিযোগের বিষয়ে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, “আমার অধীনে ১৫টির মতো বিদ্যালয় রয়েছে। এলাকাভিত্তিক দায়িত্ব ভাগ করা থাকায় নির্দিষ্ট কিছু বিদ্যালয়ে যাতায়াত বেশি হতে পারে। প্রশাসনিক স্বার্থেই প্রধান শিক্ষকেরা যোগাযোগ করেন, এখানে কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই।”
তবে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের এলাকাভিত্তিক নির্দিষ্ট বিদ্যালয় ভাগ করে দেওয়ার বিষয়টি জানা নেই বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রকিব ভূঁইয়া। তিনি বলেন, “এমন কোনো এলাকাভিত্তিক নির্ধারিত ভাগ বা পরিদর্শন ব্যবস্থা আপাতত নেই।”
বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারিয়া দেবনাথ জানান, অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাখাওয়াত এরশেদ বলেন, “আমরা তিনটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়গুলো তদন্ত করে যথাযথ আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তাহির আহমদ/ মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: