সুনামগঞ্জে মরা চেলা নদীতে শত ড্রেজারের বালু তাণ্ডব

তীরবর্তী ১০টি গ্রাম পুরোপুরি বিলীনের শঙ্কা

সুনামগঞ্জে মরা চেলা নদীতে শত ড্রেজারের বালু তাণ্ডব

লতিফুর রহমান রাজু. সুনামগঞ্জ

০৬/১০/২০২৬ ১৪:৩২:০৯

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সুনামগঞ্জের ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্ত নদী চেলার একটি অংশ ‘মরা চেলা’। দীর্ঘদিন ধরে এ নদীতে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা প্রকাশ্যেই অবিকল তাণ্ডব চালিয়ে শতাধিক ড্রেজার ও সেভ মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীর দুই পারের ১০টি গ্রাম, বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, সড়ক ও ফসলি জমি তীব্র নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন তীরবর্তী শত শত পরিবার।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর ইজারাধীন মূল অংশ শান্ত  থাকলেও মরা চেলার মুখে যেতেই কানে আসে ড্রেজারের বিকট শব্দ। রাত ১২টা থেকে ভোর পর্যন্ত প্রায় শতাধিক ড্রেজার ও সেভ মেশিন দিয়ে নদীর পাড় ও ফসলি জমির চারপাশ কেটে বাল্কহেড ও নৌকায় বালু ভরা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ড্রেজার তাণ্ডবে এরই মধ্যে ‘কলাবাগান’ ও ‘গেদুর ঢালা’ নামের দুটি পুরো এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এক সময়ের গেদুর ঢালা খালটি এখন মরা চেলার চেয়েও বড় নদীতে রূপ নিয়েছে। এভাবে বালু তোলা অব্যাহত থাকলে সোনাপুর উত্তর, সোনাপুর পূর্ব ও দক্ষিণসহ অন্তত ১০টি গ্রাম পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে।

অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট এই তাণ্ডব চালাচ্ছে। দুই দিনে (৪৮ ঘণ্টায়) এই চক্রটি অন্তত ২০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের বালু লুট করেছে। প্রায় এক কিলোমিটার দূর থেকেও ড্রেজারের গর্জন শোনা গেলেও রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ। চাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার প্রশাসনিক সীমান্ত জটিলতার সুযোগ নিয়ে সিন্ডিকেটটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রশাসন টাস্কফোর্সের অভিযান চালিয়ে দুজনকে আটক করে এক লাখ টাকা জরিমানা করলেও তাতে থামেনি বালু তোলা। স্থানীয়দের দাবি, মূল অপরাধী ও ড্রেজার অক্ষত রেখা কেবল দুজন সাধারণ শ্রমিককে আটক করার এই পদক্ষেপ লোকদেখানো। পুলিশকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে নদীর অবৈধ বালু মহাল চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন তারা।

এ বিষয়ে হাওর ও পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ‘হাউস’-এর নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, 'অবৈধ ড্রেজারের তাণ্ডবে ওই অঞ্চলের জীবনযাত্রা পুরো বিপর্যস্ত। প্রতিবেশ ও জনবসতি রক্ষায় এখনই এই তাণ্ডব বন্ধ করা দরকার।'

ছাতক নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (ওসি) অরবিন্দ সরকার জনবলসংকটের কথা স্বীকার করে জানান, সীমান্ত দুর্গম হওয়ায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় ছাতক ও দোয়ারাবাজার থানা প্রশাসন যৌথ পদক্ষেপ না নিলে এলাকাটি পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।

অন্যদিকে দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অরুপ রতন সিং জানান, ভৌগোলিক দুর্গমতা ও দুই উপজেলার সীমানা জটিলতার কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে নৌ-পুলিশের স্থায়ী ক্যাম্প বা টহল জোরদার করলে অবৈধ বালু উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব।

সুনামগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক বলেন, 'মরা চেলায় যেভাবে বালু তোলা হচ্ছে, তাতে পরিবেশ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে শীঘ্রই যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

হুমকির মুখে থাকা লোকালয় রক্ষায় অবিলম্বে দৃশ্যমান সরকারি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

নীরব চাকলাদার/ পূজা বাড়াইক/ প্রসি-২০২৬

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad