“হামাগুড়ি দিয়ে স্বপ্নের পথে: মনার অদম্য সাহস”
মনা। তার জীবন অন্যদের মতো স্বাভাবিক নয়। জন্মগতভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধী মনা—বাঁ হাত, বাঁ পা এবং কোমরের দুর্বলতার কারণে সে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। ডান হাত ও ডান পায়ের শক্তির ওপর ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করে সে। কিন্তু এই প্রতিবন্ধকতা কখনো তার অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে থামাতে পারেনি।
মাধ্যিমক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে কলেজ পর্যন্ত মনা প্রতিদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, প্রায় দেড় কিলোমিটার হামাগুড়ি দিয়ে বাড়ি থেকে বাস পর্যন্ত যেত। তারপর বাসে চড়ে কলেজে পৌঁছাত। এভাবেই জীবনযুদ্ধ চালিয়ে মনা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাজীবন শেষ করেছে। সম্প্রতি সে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে জিপিএ ২.৫ নিয়ে।
মনার স্বপ্ন বড়—শিক্ষক হয়ে সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু দারিদ্র্য ও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে পরিবারের কাছে সে আর শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি পাচ্ছে না।
মনার মা, আমিনা বেগম, বলেন, “আমার মেয়ে জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী। আমি তাকে কখনো অন্যরকম চোখে দেখিনি। অন্য সন্তানদের মতোই তাকে বড় করেছি। আমার কষ্টের মাঝেও সে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে আমি তার উচ্চশিক্ষা চালাতে পারছি না।”
মনার বাবা, হারিছ মিয়া, দিনমজুরি করেন। ছোট ভাইও দিনমজুরি করেন। পরিবারে আর্থিক সমস্যা থাকায় মনা পরিবারের পাশে থেকেও নিজের স্বপ্নের পথে এগোতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা হিসেবে প্রতি তিন মাসে ৮৫০ টাকা পান মনা।
মনার কলেজের অধ্যক্ষ জহির উদ্দিন বলেন, “মনার ইচ্ছা ও সাহসিকতা চমকপ্রদ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনো তার স্বপ্নকে দমাতে পারেনি। আমাদের কলেজে সে সবসময় উদ্যমী ছাত্রী হিসেবে উপস্থিত থাকে। আশা করি তার এই সাহসিকতা আরও প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার পথে অনুপ্রাণিত করবে।”
মনার প্রতিবেশীরা বলেন, “ছোটবেলা থেকেই মনা পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে। কষ্টে হলেও সে তার স্বপ্নের পথে অটল। আমরা চাই বিত্তবানরা তার পাশে দাঁড়াক।”
মনার গল্প আমাদের শেখায়, জীবনের কঠিনতম প্রতিবন্ধকতাকেও যদি অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় দিয়ে জয় করা যায়, তবে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়। সে শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্য শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চায়—আর সেই পথে সে থেমে থাকবে না।
রোদ্দুর রিফাত
মন্তব্য করুন: