আত্মসমর্পণ নয়, আরো কঠোর আঘাতের ইঙ্গিত ইরানের
খামেনেয়ীর মৃত্যুর পর বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কট্টরপন্থী সদস্যরা আরো সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে, যারা ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ের চেয়ে পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইকে বেশি গুরুত্ব দেয়। বর্তমান নেতৃত্বের ওপর বড় আঘাত আসা সত্ত্বেও, ইরান তাদের শত্রুদের ওপর পাল্টা আঘাত হানার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। এরইমধ্যে তারা ইসরাইল, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও মিসাইল হামলা শুরু করেছে। ইসরাইলের অভ্যন্তরেও এই হামলার প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। ইরানের ওপর ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযান একটি বড় ধরনের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য এবং সুনির্দিষ্ট বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীসহ দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান এবং সেনাপ্রধানের মতো শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হত্যা করা হয়েছে। বর্তমানে ইরানের কৌশলগত সামরিক স্থাপনা এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল লঞ্চারগুলো লক্ষ্য করে নিয়মিত হামলা চালানো হচ্ছে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, এই যুদ্ধ আরো কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে এবং এর শেষ কোথায় তা এখনই বলা কঠিন। তবে খামেনেয়ীর মৃত্যু মানেই যে ইরান দ্রুত আত্মসমর্পণ করবে, এমন কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। ইরানি শাসনব্যবস্থা দীর্ঘ সময় ধরেই এই ধরনের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে আসছিল। খামেনেয়ী নিজে তার উত্তরসূরিদের জন্য ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি পরিকল্পনা তৈরি করে গিয়েছিলেন। বর্তমান নেতৃত্বের ওপর বড় আঘাত আসা সত্ত্বেও, ইরান তাদের শত্রুদের ওপর পাল্টা আঘাত হানার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। এরইমধ্যে তারা ইসরাইল, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও মিসাইল হামলা শুরু করেছে।
ইসরাইলের অভ্যন্তরেও এই হামলার প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। গত কয়েক দিনে মিসাইল হামলায় বেশ কিছু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে এবং সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে বোম্ব শেল্টারে অবস্থান করতে হচ্ছে। তবে গত জুন মাসের যুদ্ধের তুলনায় এবারের ইরানি হামলা কিছুটা অগোছালো মনে হলেও তাদের মূল লক্ষ্য হলো বেসামরিক জনপদে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। সামরিক কৌশলের দিক থেকে এবার ইসরাইল ও আমেরিকা অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। প্রায় ২ হাজারের বেশি আকাশপথের অস্ত্র ব্যবহার করে ইসরাইল এরইমধ্যে ইরানের আকাশসীমার ওপর পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করেছে। এখন ইসরাইলি যুদ্ধবিমানগুলো সরাসরি তেহরানের আকাশে অবস্থান করে হামলা চালাচ্ছে, যা আগে অন্য দেশের আকাশসীমা থেকে করা হতো। অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে জানা যাচ্ছে যে, তিনি ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে একটি কূটনৈতিক চুক্তিতে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইরানের অনমনীয় অবস্থান এবং গোয়েন্দা নজরদারির তোয়াক্কা না করে শীর্ষ নেতাদের সশরীরে বৈঠকের জেদ শেষ পর্যন্ত তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের মতে, খামেনেয়ীকে হত্যার অনুমোদনের পেছনে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত প্রতিশোধের ইচ্ছাও থাকতে পারে, কারণ ২০২১ সালে তাকে হত্যার একটি চেষ্টা ইরানের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে।
খামেনেয়ীর মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম এক প্রভাবশালী ও আমেরিকার জন্য বিপজ্জনক নেতার অবসান ঘটিয়েছে। দীর্ঘ ৩৫ বছর তিনি ইরানকে শাসন করেছেন, যা অনেকের মতে ছিল নাগরিকদের ওপর এক প্রকার জবরদস্তিমূলক চুক্তি। ইসরাইলের জন্য খামেনেয়ীর প্রস্থান স্বস্তির খবর হলেও যুদ্ধের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে এখনই জয় উদযাপন করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। খামেনেয়ীর মৃত্যুর পর বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কট্টরপন্থী সদস্যরা আরো সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে, যারা ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ের চেয়ে পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইকে বেশি গুরুত্ব দেয়। বর্তমানে সাময়িকভাবে আলী লারিজনির নেতৃত্বে একটি সরকার কাঠামো কাজ শুরু করলেও, বিপ্লবী গার্ডের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। এদিকে ইরানের অভ্যন্তরে ইন্টারনেটের ব্যাপক কড়াকড়ি সত্ত্বেও কিছু ভিডিওতে নাগরিকদের খামেনেয়ীর মৃত্যুতে আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
তবে শাসনব্যবস্থা যেকোনো ধরনের গণবিক্ষোভ দমাতে রাজপথে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিকভাবেও সউদী আরবের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো জনসমক্ষে শান্তির কথা বললেও, পর্দার আড়ালে ইরানের ওপর সামরিক চাপের পক্ষে ছিল বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্প কি এই যুদ্ধকে আরো প্রলম্বিত করে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে চাইবেন, নাকি একটি কঠোর পরমাণু চুক্তির বিনিময়ে দ্রুত যুদ্ধবিরতিতে যাবেন। নেতানিয়াহু এই সুযোগে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্য সম্পূর্ণ বদলে দিতে চাইলেও, শেষ সিদ্ধান্তটি আসবে হোয়াইট হাউজ থেকেই। হারেৎজ।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: