রুগ্ন শৈশবে ঝুঁকির মুখে ভবিষ্যৎ
মৌলভীবাজারে চা বাগানে পুষ্টিহীনতায় কয়েক হাজার শিশু
চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের সবুজ চা বাগানগুলোর দৃশ্যমান সৌন্দর্যের আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে হাজার হাজার শিশুর রুগ্ন মুখ। দেশের অর্থনীতিতে চা শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য হলেও, এই শিল্পের কারিগর চা শ্রমিকদের সন্তানদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য জরিপ ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, চা বাগানের প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ শিশু খর্বকায়, যা জাতীয় হারের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া বাগানগুলোতে জন্ম নেওয়া শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ তীব্র পুষ্টিহীনতায় এবং ৭০ শতাংশ শিশু রক্তাল্পতায় ভুগছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চা বাগানের শিশুদের এই পুষ্টিহীনতার মূলে রয়েছে শ্রমিকদের অতি নিম্নমানের জীবনযাপন ও চরম দারিদ্র্য। বর্তমানে একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৭০ টাকা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এই সামান্য আয়ে পুষ্টিকর খাবার কেনা তাঁদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে শিশুদের পাতে মাছ, মাংস বা দুধের পরিবর্তে জুটছে কেবল লবণ-পান্তা ভাত কিংবা আলু ভর্তা। পাত্রখোলা চা বাগান পাবলিক লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা লিটন গঞ্জু বলেন, "স্বল্প মজুরির কারণে শ্রমিকরা সন্তানদের জন্য পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারেন না। পাশাপাশি নারী শ্রমিকরা সারাদিন কাজে থাকায় শিশুরা সঠিক যত্ন পায় না।"
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক উপদেষ্টা রামভজন কৈরি জানান, মায়েদের স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব এবং গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত পুষ্টি না পাওয়াই এই সংকটের প্রধান কারণ। অনেক মা সন্তান জন্ম দেওয়ার অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই কাজে যোগ দিতে বাধ্য হন, ফলে শিশুরা পর্যাপ্ত মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত হয়। এছাড়া বাগানের দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে শিশুরা ঘনঘন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। তিনি শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং রেশনে পুষ্টিকর খাদ্যের বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান।
কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুল আলম ভূঁইয়া এই পরিস্থিতিকে ‘চক্রাকার পুষ্টিহীনতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, "অপুষ্টির কারণে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও সচেতনতার অভাবে অনেক শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাচ্ছে না।" চা বাগান আমাদের অর্থনীতির প্রাণ হলেও, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থভাবে গড়ে তুলতে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: