সীমান্তে বিএসএফ-বিজিবি গোলাগুলি
শ্যাম কালিয়ার লাগিয়া...
সরকার বদল হয়, ক্ষমতার রঙ বদলায়, কিন্তু বদলায় না সিলেট সীমান্তের চেনা ছবি। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় রাতারাতি ভোল পাল্টে একদল গডফাদার বরাবরই সীমান্তকে করে রাখছে উত্তপ্ত। মোটা অঙ্কের মাসোহারা আর প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে সীমান্ত চোরাচালান যেন এক অজেয় সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের মুখে মুখে এখন একটাই আক্ষেপের সুর— ‘শ্যাম কালিয়ার লাগিয়া’। এই ‘শ্যাম কালা’র সিন্ডিকেটের কারণেই বারবার অশান্ত হচ্ছে সীমান্ত, যার সর্বশেষ নজির মিলেছে গত সোমবারের বিজিবি-বিএসএফ অনাকাঙ্ক্ষিত গোলাগুলির ঘটনায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত সোমবার বিকেলে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনারহাট সীমান্তে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিএসএফ)-এর মধ্যে ঘটে যাওয়া গোলাগুলির ঘটনার নেপথ্য নায়ক গোয়াইনঘাটের সীমান্তবর্তী হাতিরখাল গ্রামের বাসিন্দা শামসুদ্দিন কালা ওরফে 'শ্যাম কালা'। দীর্ঘদিন ধরে এই সীমান্ত এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করে চোরাচালানের সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে সে।
স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, সোমবার বিকেলে সোনারহাট সীমান্ত দিয়ে শ্যাম কালার একটি চক্র বিপুল পরিমাণ ভারতীয় চোরাই মোটরসাইকেল বাংলাদেশে আনার চেষ্টা করছিল। এ সময় বিএসএফ সদস্যরা তাদের বাধা দিলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে শ্যাম কালার সশস্ত্র লাঠিয়াল বাহিনী। তারা উল্টো বিএসএফ সদস্যদের ওপর হামলার চেষ্টা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিএসএফ গুলি ছুড়তে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে, জাতীয় নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার্থে বিজিবি সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালায়। দুই দেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মূল হোতা শ্যাম কালা হলেও, সে এখনো বহাল তবিয়তে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
প্রশাসনের ‘আশীর্বাদ’ ও রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার গল্প
অনুসন্ধানে আরও কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এসেছে। শ্যাম কালা কেবল একজন সাধারণ চোরাকারবারীই নয়, বরং সিলেট জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও স্থানীয় থানার কয়েকজন কর্মকর্তার বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের মূল ‘তহবিল যোগানদাতা’।
সিলেট জেলা ডিবির সাবেক ওসি রেফায়েত ও ইকবালকে কোটিপতি বানানোর পেছনে মূল ভূমিকা ছিল এই শ্যাম কালার। এছাড়া গোয়াইনঘাট থানার সাবেক ওসি রফিকুল ইসলামের শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের পেছনেও এই সিন্ডিকেটের সরাসরি হাত ছিল বলে জোরালো গুঞ্জন রয়েছে।
সাবেক কর্মকর্তাদের বিদায়ের পর বর্তমান জেলা ডিবির দুই ওসি আনোয়ার ও আসরাফ এবং গোয়াইনঘাট থানার বর্তমান ওসির বিরুদ্ধেও একই সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। দ্রুত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার মোহে তারা শ্যাম কালাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরোক্ষ ছত্রছায়ায় শ্যাম কালা সীমান্তে তার সাম্রাজ্য আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
চোরাকারবারীদের এই লাগামহীন দৌরাত্ম্যের কারণে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে যেমন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছে, তেমনি সাধারণ সীমান্তবাসীর জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে পড়ছে। পুলিশ ও ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরোক্ষ আশকারা পাওয়ায় স্থানীয় প্রশাসনও এই গডফাদারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হিমশিম খাচ্ছে।
সোনারহাট সীমান্তে এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর পুরো এলাকায় এখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। সিলেটের সচেতন মহল মনে করছেন, শ্যাম কালা এবং তার পেছনের মদদদাতা পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্তপূর্বক আইনি ব্যবস্থা না নিলে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত অপরাধ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: