‘বাজেট কী, এর ভিতরে কী থাকে?’

চা-শ্রমিকদের বাজেট ভাবনা

‘বাজেট কী, এর ভিতরে কী থাকে?’

বিশেষ প্রতিবেদন

১৫/০৬/২০২৬ ১১:৪৮:৫১

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

রাজধানীর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে যখন হাজার হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট পেশ হয় আর টেলিভিশন-টকশোতে চলে চুলচেরা বিশ্লেষণ, তখন হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার চা-বাগানগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানকার অধিকাংশ শ্রমিকের কাছে ‘বাজেট’ যেন অন্য কোনো গ্রহের শব্দ। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় এই আয়-ব্যয়ের খতিয়ান নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই, জানার সুযোগও নেই; কারণ প্রতিদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি আর পেটের দায় মেটানোই তাদের একমাত্র বাস্তব যুদ্ধ।


মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া, বৈকুণ্ঠপুর, জগদীশপুর, তেলিয়াপাড়া ও সুরমা চা বাগানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাতীয় বাজেট কী, এতে তাদের ভাগ্যবদল হবে কি না—তা নিয়ে শ্রমিকদের মনে কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই।


নোয়াপাড়া চা বাগানের প্রবীণ শ্রমিক রমেশ সাঁওতাল ক্ষোভ ও আক্ষেপ মিশিয়ে বলেন-বাজেট বুঝি না, শুধু বুঝি পেটের ক্ষুধা।  তিনি বলেন,  “বাজেটের কথা টেলিভিশনে শুনি, কিন্তু এর ভিতরে কী থাকে তা জানি না। আমাদের চিন্তা সপ্তাহ শেষে মজুরিটা ঠিকমতো পাব কি না, সন্তানদের মুখে দুমুঠো অন্ন জুটবে কি না। বাজেট দিয়ে আমাদের কী হবে?”


একই বাগানের নারী শ্রমিক শ্যামলী মুন্ডা সরাসরি আঙুল তুললেন বাজারদরের দিকে। তিনি বলেন,“বাজারে গেলেই দেখি সবকিছুর দাম বাড়ছে, কিন্তু আমাদের মজুরি বাড়ে না। বাজেটে আমাদের মতো গরিবদের জন্য কিছু থাকে কি না, তা কেউ কখনো এসে আমাদের জানায় না। আমরা শুধু চাই, এমন নিয়ম হোক যাতে দুবেলা খেয়ে-পরে বাঁচতে পারি।”


স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, দেশের অর্থনীতিতে চা শিল্প কোটি কোটি টাকার অবদান রাখলেও চা-শ্রমিকদের বড় অংশ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে ধুঁকছেন। বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও সুশিক্ষার অভাব এখানে বংশানুক্রমিক। সাম্প্রতিক সময়ে হবিগঞ্জের বেশ কয়েকটি বাগানে বকেয়া মজুরি ও রেশনের দাবিতে শ্রমিকদের রাস্তায় নামতে হয়েছে, করতে হয়েছে কর্মবিরতি। যে শ্রমিকরা নিজেদের ন্যায্য মজুরি পেতেই আন্দোলন করতে বাধ্য হন, তাদের কাছে জাতীয় বাজেট এক প্রকার বিলাসিতা মাত্র।


তবে চরম সংকটের মধ্যেও স্থানীয় সংসদ সদস্যের কিছু তৎপরতা শ্রমিকদের সামান্য স্বস্তি দিয়েছে। কয়েকজন শ্রমিক জানান, মাধবপুর-চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ-৪) আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ মো. ফয়সল ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বাগানে গভীর নলকূপ স্থাপন, কর্মবিরতির সময় খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য 


শ্রমিক নেতাদের দাবি, জাতীয় বাজেটে প্রতিবছরই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ থাকে, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর সচেতনতার অভাবে তা চা-বাগান পর্যন্ত পৌঁছায় না। চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা এবং শিশুদের শিক্ষার জন্য বাজেটে ‘বিশেষ থোক বরাদ্দ’ রাখা এখন সময়ের দাবি।


অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক নীতিমালার সুফল থেকে এই জনগোষ্ঠীকে বছরের পর বছর বঞ্চিত রাখা হয়েছে। বাজেট ঘোষণার পর আলোচনা শুধু বড় বড় শহর আর ব্যবসায়ী মহলেই সীমাবদ্ধ থাকে। গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে বাজেটের বার্তা পৌঁছানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না।


দিনশেষে চা-শ্রমিকদের সোজাসাপ্টা কথা— “আমরা বাজেট বুঝি না, কাগজের হিসাবও বুঝি না। শুধু এমন একটা বাজেট চাই, যা আমাদের পেটের ক্ষুধা দূর করবে এবং জীবনটাকে একটু সহজ করবে।”

ডি আর ডি

মন্তব্য করুন: