বাংলাদেশে শাখা তৈরির চেষ্টা করছে আল-কায়েদা: জাতিসংঘ
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদার অনুসারী গোষ্ঠী ‘আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট’ (একিউআইএস) বাংলাদেশে নতুন করে জঙ্গি আস্তানা বা ‘সেল’ গঠনের জোর তৎপরতা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। বাংলাদেশকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে এই আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক বিস্তারের চেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য জটিল ঝুঁকি তৈরি করেছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) প্রকাশিত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৩৮তম এই নজরদারি প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একিউআইএস বড় কোনো ইউনিটের পরিবর্তে ছোট ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিকেন্দ্রীভূত ‘সেল’ বা শাখার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করে আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তারা লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লাল কেল্লার কাছে হামলার জন্য একিউআইএস-কে দায়ী করেছে জাতিসংঘ। মেট্রো স্টেশনের কাছের ট্র্যাফিক সিগন্যালের ওই হামলা ১৫ জন নিহত হয়েছিলেন।
আল-কায়েদা ও আইএসআইএল (দায়েশ) বিগত বহু বছর ধরে মারাত্মক রাসায়নিক ও জৈবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালিয়ে আসছে বলে জাতিসংঘের এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। যদিও প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে তারা এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সাফল্য পায়নি। তবে অনলাইনে এসব মারণাস্ত্র ও বিষাক্ত উপাদান তৈরির নির্দেশাবলী ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আইএসআইএল বা দায়েশ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাদের ইংরেজি ভাষার ম্যাগাজিন ‘ইনভেড’-এ বোটুলিনাম টক্সিন ও সায়ানাইড তৈরির বিস্তারিত পদ্ধতি প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া গোষ্ঠীটি মারাত্মক ‘রিসিন’ নামক বিষ তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রচারণা চালিয়েছে। ২০২৫ সালের শেষের দিকে ভারতে একজন চিকিৎসকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিদেশে অবস্থানরত একটি আইএসআইএল সেল তাদের বাংলাদেশে ও ভারতে প্রয়োগের উদ্দেশ্যে রিসিন তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিল।
অন্যদিকে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে টানা সংঘর্ষ ও আন্তঃসীমান্ত হামলার কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা বর্তমানে চরম উচ্চতায় রয়েছে। আফগান তালেবান তাদের ভূখণ্ডে কোনো সন্ত্রাসীকে আশ্রয় দেওয়ার কথা অস্বীকার করলেও, সংস্থাগুলো বলছে, আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে সীমান্ত অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদের হুমকি অপরিবর্তিত রয়েছে। কার্যত তালেবান কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করা সত্ত্বেও এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ হওয়ায় নিরাপত্তা সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও তুলে ধরা হয় যে, গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বার্ষিক ‘রাহবারি শুরা’ (নেতৃত্ব পরিষদ) বৈঠকের পর নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পুনর্গঠন করেছে। নতুন এই বিন্যাসে তারা ‘বেলুচিস্তান ও মধ্যাঞ্চল’ এবং ‘কাশ্মীর ও গিলগিট’ নামে দুটি নতুন প্রশাসনিক বিভাগ যুক্ত করার পাশাপাশি ‘টিটিপি বিমান বাহিনী’ নামে একটি বিতর্কিত সামরিক ইউনিট চালুর ঘোষণা দিয়েছে, যা পুরো অঞ্চলে নতুন করে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দল জানিয়েছে, একিউআইএস বর্তমানে পাকিস্তানে সক্রিয় ‘ইত্তিহাদ-উল-মুজাহিদিন পাকিস্তান’ (টিএমপি)-এর প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। আফগানিস্তানের কাবুলে অবস্থানরত সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা শাসকগোষ্ঠী আফগান তালেবানের সঙ্গে সরাসরি নিবিড় যোগাযোগ রাখছেন। সম্প্রতি আল-কায়েদার প্রচার মাধ্যম ‘আস-সাহাব মিডিয়া ফাউন্ডেশন’ তালেবান ও টিটিপির প্রতি তাদের প্রকাশ্য সমর্থনও ব্যক্ত করেছে।
২০২৬ সালের ৯ জুন পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক চাপে কিছুটা কোণঠাসা হলেও দক্ষিণ এশিয়া ও সাহেল অঞ্চলে তাদের আঞ্চলিক শাখাগুলো ক্রমান্বয়ে নিজস্ব প্রভাব ও নাশকতামূলক সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: