একাধিক মামলা মাথায় নিয়েও কোম্পানীগঞ্জে অধরা পাথরখেকো জিন্নাহ

গিরগিটির মতো রূপ বদল

একাধিক মামলা মাথায় নিয়েও কোম্পানীগঞ্জে অধরা পাথরখেকো জিন্নাহ

রোদ্দুর ‍রিফাত, নিজস্ব প্রতিবেদক

১৯/০৮/২০২৬ ২২:২৩:৫২

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

রাজনীতি কিংবা ক্ষমতার পটপরিবর্তন—কোনো কিছুই দমাতে পারছে না সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের আলোচিত ‘বালু ও পাথরখেকো’ চক্রকে। পাহাড়-টিলা থেকে শুরু করে সমতল কিংবা নদী—সর্বত্রই যেন সমান দাপট তাঁদের। যে ব্যক্তির হাত ধরে পুরো কোম্পানীগঞ্জে অবৈধ পাথর উত্তোলনের তাণ্ডব চলছে, তিনি একাধিক মামলার আসামি ও ‘মেসার্স বশির কোম্পানি’র স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তাঁর তাণ্ডবেই ধ্বংস হয়ে গেছে ঐতিহাসিক শাহ আরেফিন টিলা; সেখানে এখন কেবল গভীর গর্তের চিহ্ন।

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সবাই যেন এই জিন্নাহ চক্রের কাছে জিম্মি। একাধিক মামলার খড়্গ মাথায় নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও প্রভাবের কারণে তিনি সর্বত্র সমীহ পান। অনেকটা গিরগিটির মতোই ক্ষমতার পালাবদলে রাজনীতির খোলস পাল্টে নতুন নতুন আশ্রয় খুঁজে নেন জিন্নাহ।

শাহ আরেফিন টিলা সংলগ্ন এলাকার ৬৭ বছর বয়সী দিনমজুর সোলেমান আক্ষেপ করে বলেন, "জিন্নাহ পরিবারের হাত ধরে কোম্পানীগঞ্জের টিলার মাটি, বালু ও পাথর সবকিছু নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। এখানকার প্রতিটি পাথরও জিন্নাহকে দেখলে আঁতকে ওঠে।"

তানভির নামে অপর এক স্থানীয় যুবক হতাশ কণ্ঠে বলেন, "এসব লিখে কোনো লাভ হবে না। জিন্নাহ পরিবার এই সাম্রাজ্যে খুবই প্রভাবশালী। প্রশাসনের সঙ্গেও তাদের গভীর সখ্য। তাদের বিরুদ্ধে আরও এক ডজন মামলা হলেও কিচ্ছু হবে না। দল ও বল মিলিয়ে টিলা সাম্রাজ্যে এক অপ্রতিরোধ্য নাম এই জিন্নাহ।"

ইতিহাস বলে, হযরত শাহ জালাল (রহ.)-এর অন্যতম সফরসঙ্গী হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) প্রায় ৭০০ বছর আগে ইসলাম প্রচারের সময় কোম্পানীগঞ্জের পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নের ঝালিয়ারপাড় এলাকায় একটি টিলায় আস্তানা গেড়েছিলেন। তাঁর নামানুসারেই এর নামকরণ হয় 'শাহ আরেফিন টিলা'। তবে ১৩৭.৫০ একর সরকারি খাসজমির ওপর গড়ে ওঠা প্রাচীন সেই স্মৃতিবিজড়িত টিলা আজ আর নেই। ভারী যন্ত্র (বোমা মেশিন) দিয়ে কেটে সেখানে তৈরি করা হয়েছে বিশাল ও বিপজ্জনক সব গর্ত। বিলীন হয়ে গেছে পার্শ্ববর্তী কবরস্থান, মাজার, মসজিদ ও বসতভিটা। টিলার একাংশে কোনো রকমে একটি মসজিদ টিকলেও ধসের ভয়ে সেখানে নামাজ পড়তে যেতে সাহস পান না মুসল্লীরা।

আশ্চর্য্যের  বিষয় হলো- আরেফিনি টিলায় মাজার না থাকলেও রয়েছেন খাদেমগন। খাদেমদের মধ্যে রয়েছে দুটি ভাগ। খাদেমদের কারো দাবি-‘নতুন’ আবার কেউ ‘সাবেক’ বলে টিলা কাটার ভাগ পেয়ে থাকেন। 

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর উপজেলার কাঠালবাড়ি (শিমুলতলা) গ্রামের ইউপি চেয়ারম্যান জিয়াদ আলীর ছেলে। গত ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে কোম্পানীগঞ্জ ও ছাতকের বালু মহাল এবং পাথর কোয়ারি লুটপাটের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল তাঁর। তবে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর দ্রুত রূপ পাল্টে বিএনপি ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ভাঙিয়ে এলাকা ফের দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। নতুন করে ধলাই ও পিয়াইন নদী থেকে শুরু করে টিলাভূমি পর্যন্ত অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন কোটি কোটি টাকার সাম্রাজ্য।

অনুসন্ধানে জানা যায়, খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো থেকে ২০০০ সালে শাহ আরেফিন টিলার ৬১ একর জমি পাথর উত্তোলনের জন্য ইজারা নেয় জিন্নাহর প্রতিষ্ঠান 'মেসার্স বশির কোম্পানি'। কিন্তু শর্ত ভেঙে বোমা মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে পাথর তোলায় সে বছরই ইজারা বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে ক্ষমতার জোরে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র তোয়াক্কা না করেই পুরো টিলাকে বিরানভূমিতে পরিণত করা হয়।

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জিন্নাহ অবৈধভাবে ৬২ লাখ ৮৮ হাজার ৭৫০ ঘনফুট পাথর বিক্রি করে ২৫১ কোটি ৫৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুদক। এ ছাড়া ৭০০ বছরের ঐতিহাসিক স্মৃতি ধ্বংসের অভিযোগে সম্প্রতি সিলেটের স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (পরিবেশ) পরিবেশ অধিদপ্তর ৪০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে, যার প্রধান আসামি জিন্নাহ। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও অলৌকিক বলয়ে তিনি অধরাই থেকে গেছেন।

টিলা ধ্বংসের পাশাপাশি অসাধু উপায়ে পাথর তুলতে গিয়ে এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক শ্রমিকের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে, যা জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনেও প্রমাণিত। অন্যদিকে, ধলাই ও পিয়াইন নদীতে ‘মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’-এর আড়ালে এম সাইফুর রহমান সেতুর নিচ থেকে শুরু করে ইসলামপুর বাজার ও ঢালারপাড় চকবাজার পর্যন্ত দিনরাত বালু তোলা হচ্ছে। পরিকল্পনাহীন ও অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের ফলে তীব্র নদীভাঙনে বুড়িডহর হাজী হাছন আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মোস্তফানগর বাইতুন আমান জামে মসজিদ, শিমুলতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ বিস্তীর্ণ এলাকার ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি এখন নদীগর্ভে বিলীন হতে বসেছে।

প্রাপ্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বুধবার বিকেল সাড়ে ৪ টায় জিন্নাহ’র ব্যক্তিগত সেলফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেন নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর মতামত জানা সম্ভব হয় নি। 

স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের চরম নীরবতা এবং জিন্নাহ চক্রের হুমকিতে স্থানীয়রা মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে একদিকে কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে কোম্পানীগঞ্জের পরিবেশ, ইতিহাস ও জনজীবন।

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad