হবিগঞ্জে ছাত্রদল নেতাসহ ৬২ জনের বিরুদ্ধে গাছ চুরির মামলা

হবিগঞ্জে ছাত্রদল নেতাসহ ৬২ জনের বিরুদ্ধে গাছ চুরির মামলা

নিজস্ব প্রতিনিধি, হবিগঞ্জ

১৯/০৮/২০২৬ ২৩:২৮:২৫

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য থেকে অবৈধভাবে গাছ কাটা, চুরি এবং চোরাই কাঠ কেনাবেচার অভিযোগে ৬২ জনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় চুনারুঘাট উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মো. মারুফ মিয়াকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। একই ঘটনায় বন বিভাগের পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তাদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) চুনারুঘাট থানায় মামলা দুটি দায়ের করেন কালেঙ্গা রেঞ্জ কর্মকর্তা এইচ এম এরশাদ ও সাতছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা মোবারক হোসেন। এর মধ্যে রেঞ্জ কর্মকর্তা মোবারক হোসেন বাদী হয়ে মারুফ মিয়াকে প্রধান আসামি করে ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। অন্য মামলায় আরও ৪২ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। দুই মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৬২ জন।

সংশ্লিষ্ট নথি ও বন বিভাগের বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সাতছড়ি ও রেমা-কালেঙ্গা বনাঞ্চল থেকে দীর্ঘদিন ধরে গাছ কাটা, বনজ সম্পদ পাচার এবং চোরাই কাঠ কেনাবেচার অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়।

প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ১৬ জুলাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সাতছড়ি ও রেমা-কালেঙ্গা বনাঞ্চলে গাছ কাটা, চুরি ও পাচারের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ২১ জুলাই বন বিভাগের পক্ষ থেকেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

একই সঙ্গে বন বিভাগের পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযোগের পর তাদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশের প্রায় এক মাস পর গাছ কাটা ও চোরাই কাঠের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হলো।

বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে গাছ কাটা ও চুরি, বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংশ্লিষ্টতা এবং চোরাই কাঠ কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আলাদা করে তিনটি তালিকা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের ‘ক’ তালিকায় গাছ কাটা ও চুরির সঙ্গে জড়িত হিসেবে ৩৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ওই তালিকায় চুনারুঘাট উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মো. মারুফ মিয়ার নামও রয়েছে।

তালিকায় মারুফ মিয়াসহ মুনায়েম, শফিকুল ইসলাম, কালা মিয়া, আব্দুল কুদ্দুস, জসিম, তাহির মিয়া, আব্দুল জলিল মিয়া, রফিক মিয়া, হেলাল মিয়া, মকবুল মিয়া ও মাসুম বিল্লাহসহ বিভিন্ন ব্যক্তির নাম রয়েছে। রেমা-কালেঙ্গা এলাকার আরও কয়েকজনের নামও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে চোরাই কাঠ কেনার সঙ্গে জড়িত হিসেবে প্রতিবেদনের ‘গ’ তালিকায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে মারুফ মিয়াসহ জাহাঙ্গীর খান, শফিক মিয়া মহলাদার, করিম সরকার, বেলাল, জমরুত, সোহেল ও মিজানুর রহমান সোহাগের নাম রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ‘খ’ তালিকায় বন বিভাগের পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের সঙ্গে যোগসাজশ করে অবৈধভাবে গাছ কাটা ও চুরির সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তালিকায় রয়েছেন সাতছড়ি রেঞ্জের সাবেক বিট কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ, বিট কর্মকর্তা মেহেদী হাসান, জুনিয়র ওয়াইল্ড লাইফ স্কাউট নূর মোহাম্মদ, ফরেস্ট গার্ড সুমন বিশ্বাস এবং বাগান মালি শেখ আহমেদ।

সংশ্লিষ্ট নথিতে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বর্তমান দায়িত্ব ও চাকরিসংক্রান্ত অবস্থার বিষয়েও মন্তব্য রয়েছে। অভিযোগের পর পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

হবিগঞ্জের সীমান্তবর্তী চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলার প্রায় ২৪০ হেক্টর বনাঞ্চল নিয়ে গঠিত সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। এ উদ্যানে সাতটি পাহাড়ি ছড়া রয়েছে। বন বিভাগের আওতায় এখানে সাতছড়ি ও তেলমাছড়া নামে দুটি বিট রয়েছে।

বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর কথিত যোগসাজশে স্থানীয়ভাবে গাছ কেটে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নিরাপত্তা ও বনজ সম্পদ রক্ষায় দায়িত্বশীলদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

চুনারুঘাট ও বাহুবল উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যও দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক বনাঞ্চলগুলোর একটি। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে রেমা, কালেঙ্গা, ছনখোলা ও রশিদপুরসহ বিভিন্ন বিট থেকে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ অবৈধভাবে কেটে নেওয়া ও পাচারের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বনাঞ্চলের দুর্গম অবস্থান, মোবাইল নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা এবং সন্ধ্যার পর মানুষের চলাচল কমে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে দুষ্কৃতকারীরা গাছ কেটে পাচার করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া চোরাই কাঠ পরিবহনের সময় স্থানীয় সড়ক ও মহাসড়কে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করেছেন চুনারুঘাট উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মো. মারুফ মিয়া। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটি মিথ্যা। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। যারা এই প্রতিবেদন দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”

তবে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তার নাম উল্লেখ এবং পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

এর আগে মারুফ মিয়ার বিরুদ্ধে অবৈধ সিলিকা বালু পাচার, মাদক সংশ্লিষ্টতা, বন বিভাগের কর্মকর্তাকে হুমকি এবং দলীয় পদ-পদবি ব্যবহার করে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিবেন।


স্বপন রবি দাশ/ নীরব

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad