স্রষ্টার সৃষ্টি
জিরো বা শূন্য (০) এর প্রচলিত অর্থ ‘কিছুই নাই’। একদম খালি। গণিত শাস্ত্রে ইহা একটি সহযোগী অংক। আর ১ থেকে ৯ পর্যন্ত প্রতীক গুলোকে অংক বলে। একাধিক অংক মিলে একটি সংখ্যা গঠিত হয়। ১০, ২২৩, ৫২৩৯ ইত্যাদি। ‘০’ কোনো অংক বা সংখ্যার ডানে বসালে ঐ অংক বা সংখ্যার মান বৃদ্ধি পায়। ১ এর ডানে ‘০’ বসালে এর মান ১০ গুন বৃদ্ধি পেয়ে ১০ হয়। ৯৯ এর ডানে ‘০’ বসালে ৯৯০ হয়। এক্ষেত্রে ‘০’ এর মানে ‘কিছুইনা’ বলা যায়না। আবার ‘০’ এর ডানে বা বায়ে এক বা একাধিক ‘০’ বসালে এর মানের কোনো হ্রাস/বৃদ্ধি হয়না। ইহা ‘০’ ই থাকে। যেমন— ০০, ০০০ ইত্যাদি। ‘০’ এর সাথে কিছু যোগ করলে মান বৃদ্ধি পায়না। যেমন— ০ + ৫ = ৫। ‘০’ থেকে কিছু বিয়োগ করলে মান হ্রাস পায়না। যেমন ০ - ৫ = -৫। কোনো অংক বা সংখ্যাকে ‘০’ দ্বারা গুণ করলে ‘০’ হয়। কোনো অংক বা সংখ্যাকে ‘০’ দ্বারা ভাগ করলে এর মান অসীম (∞) হয়। আবার ০÷০ = অনির্ণেয় সংখ্যা।
গণনায় ক্ষেত্রে আমরা ‘০’ থেকে শুরু করি; যেমন— ০, ১, ২, ৩ (ধনাত্মক) ইত্যাদি। এভাবে গুনতে থাকলে কোনো শেষ সংখ্যা পাওয়া যাবেনা। অর্থাৎ ধনাত্মক সংখ্যা অসীম। এর শেষ নেই। আবার গুনতে থাকি ০, -১, -২, -৩ (ঋণাত্মক) ইত্যাদি। অনন্তকাল গণনা করে শেষ ঋণাত্মক সংখ্যা পাওয়া যাবেনা। ঋণাত্মক সংখ্যাও অসীম। ধরা যাক, ধনাত্মক দিকে গুনে ১০,০০০,০০০ একটি সংখ্যা নির্ণয় করা হলো। একইভাবে ঋণাত্মক দিকে গুনে -১০,০০০,০০০ অপর একটি সংখ্যা পাওয়া গেলো। দুটিরই সূচনা ‘০’ হতে। সংখ্যা দুটিকে (+১০০০০০০০ – ১০০০০০০০= ০) যোগ করলে মান ‘০’ হবে। একই ভাবে +∞-∞= ০ হবে। মোদ্দা কথা, ‘০’ হতে ধনাত্মক বা ঋণাত্মক দিকে অনন্তকাল গণনা করা হলেও শেষ সংখ্যা বলতে কিছুই পাওয়া যাবেনা।
কেউ যদি বলেন, "আমাকে শেষ সংখ্যাটি পেতে হবে”। ইহা কি সম্ভব? না, মোটেই না। নিজের মেধা, কম্পিউটারা বা সুপার কম্পিউটার দ্বারা গণনা করলেও শেষ সংখ্যা পাওয়া যাবেনা, ইহা অরণ্যে রোদন। আচ্ছা, ঠিক আছে। ধরলাম, আপনি একটি শেষ সংখ্যা পেয়েছেন। কয়েক লক্ষ কোটি ট্রিলিয়ন। আপনার নির্ণয় সংখ্যার সাথে আরো এক (১) যোগ করুন। এটা কি আর শেষ সংখ্যা থাকলো? না, থাকলো না। অতএব, সংখ্যার শেষ নেই, গণনারও শেষ নেই।
বিজ্ঞানিদের ধারণা, মহা বিশ্ব সৃষ্টি হয় এক অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দু হতে। যার ভর ও তাপ ছিল অসীম। প্রায় ১৩.৭ বিলিয়ন বছর পূর্বে বিগ ব্যাং বা মহা বিস্ফোরণের মাধ্যমে বিন্দুটি বিস্ফোরিত হয়। তখন থেকে এ মহা-বিশ্বের সৃষ্টি। এখনও মহা বিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে। মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল। চিন্তাবিদদের ধারণা, মহা বিশ্বের সীমা, পরিসীমা নেই। মহা বিশ্ব অসীম।
ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি, সংখ্যার সীমা নেই, সংখ্যা অসীম।
“সীমার মাঝে, অসীম, তুমি
বাজাও আপন সুর,
আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ
তাই এত মধুর।”
ইহা বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি গান বা কবিতা। তাঁর কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলির অন্তর্ভুক্ত। তিনি ঈশ্বরকে অসীম রূপে কল্পনা করছেন। ঈশ্বরের ক্ষমতা অসীম। তাই তিনি নিজেও অসীম।
অনেকের চিত্তে প্রশ্নের উদ্রেক হয়, "সৃষ্টিকর্তা কীভাবে সৃষ্টি হলেন।" আমাদের ক্ষুদ্র জ্ঞানে এ প্রশ্ন আসতেই পারে। সংখ্যা গণনাকারে শেষ সংখ্যা বের করা মানব জ্ঞানে কুলোয়না। মহা বিশ্বের সীমা পরিসীমা কতটুকু, মানুষের জ্ঞানের বাহিরে। গণনা, সংখ্যা, মহাবিশ্ব ইত্যাদি ঈশ্বরের সৃষ্টি। যিনি অসীম বিষয় বস্তু সৃষ্টি করেছেন তার ক্ষমতা অসীম। তাই তিনি নিজেও অসীম। তর্কের খাতিরে ধরা যাক, সৃষ্টিকর্তাকে কেউ সৃষ্টি করেছেন। তাহলে যিনি সৃষ্টি করেছেন, তাকে কে সৃষ্টি করেছেন? এভাবে অনন্তকাল প্রশ্ন করা যাবে। প্রশ্ন শেষ হবেনা। সৃষ্টি কর্তা আমাদের মতো রক্ত মাংসের শারীরিক অবয়বে গঠিত কোনো সত্ত্বা নন। তিনি এক অতি মহান সত্ত্বা তিনি মহাবিশ্বের সব কিছুই সৃষ্টি করেছেন। তিনি ছিলেন, আছেন ও চিরকাল থাকবেন। তিনি অনন্ত অসীম। অসীম যেকোনো বিষয়বস্তু মানব জ্ঞানের বাহিরে। সুতরাং সৃষ্টার সৃষ্টি মানব জ্ঞানের লক্ষ কোটি গুন ঊর্ধ্বে। এ প্রশ্ন অবান্তর। বিনা প্রশ্নে আমরা বল, আল্লাহ্ পাক আমাদের স্রষ্টা। তার কোন শরীক নেই।
লেখকঃ কলামিস্ট
ব্রেঞ্চ সহকারী
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, সিলেট
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: