গোয়াইনঘাটে ‘কাগজে বাঘ’ আর ‘নগদে পীর’ সিসটেম!

সীমান্তে চোরাই, পেটে গেলেই বৈধ

গোয়াইনঘাটে ‘কাগজে বাঘ’ আর ‘নগদে পীর’ সিসটেম!

নাফিজ হান্নান, নিজস্ব প্রতিবেদক

২৫/০৮/২০২৬ ০০:১৯:৪৪

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

প্রতিরাতের আঁধার নামলেই সিলেটের সীমান্তজুড়ে শুরু হয় আলিবাবা ও ৪০ চোরের চেয়েও রোমাঞ্চকর এক মহাযজ্ঞ! অস্ত্র, প্রসাধনী, ফেন্সিডিল, মসলা থেকে শুরু করে গরু-মহিষ আর বেনারসি শাড়ি—কী নেই সেই তালিকার ফর্দতে! তবে আসল ম্যাজিক সীমান্ত পার হওয়ার পরেই। ওপারে যা ‘চোরাই মাল’, এপারে নামামাত্রই স্রেফ ভেল্কিবাজিতে তা হয়ে যায় ‘নিখাদ আইনি সম্পদ’! পকেটের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যস্ত স্থানীয় প্রশাসনের অলিখিত আতিথেয়তা আর রাজনেতাদের নেপথ্য ইন্ধনে এই চোরাচালান উৎসব এখন এলাকায় দিব্যি ‘জাতীয় খেলা’র রূপ নিয়েছে।

মাঠে রয়েছে ক্যাডার বাহিনী থেকে শুরু করে চাদাবাজির ‘লাঠিয়াল ব্রিগেড’—যাদের কাজই সুযোগ বুঝে মাল আটকে কাঁচা টাকা খসাানো। আর জব্দ যদি ভুলবশত হয়েই যায়? চিন্তা নেই, সেই মাল রাতারাতি হজম করে ফেলার জন্য ‘ম্যানেজমেন্ট কেমিস্ট’ টিম তো প্রস্তুতই আছে! অভিযান হয়, গাড়ি জব্দও দেখানো হয়; তবে রাজকোষ তলাবিহীন হলেও বাবুমহলের ফুরফুরে পকেটের স্বাস্থ্য কিন্তু দিনদিন বেড়েই চলেছে। আর এই সুস্বাদু দুর্নীতির খোরাক জোগাতে গিয়ে দেউলিয়া হচ্ছেন স্থানীয় হালাল খামারি ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা।

এই ভেল্কিবাজির জ্বলন্ত মহড়া দেখা গেল গোয়াইনঘাটের বিছানাকান্দি সীমান্তে। অবৈধ ‘পীরের বাজার’ থেকে আনা ভারতীয় গরুর গায়ে ‘বৈধতার স্ট্যাম্প’ মারতে চলছে জালিয়াতির নতুন রেকর্ড!

গত ১৪ আগস্ট (শুক্রবার) বঙ্গবীর সড়কে সরেজমিন তল্লাশিতে মিলেছে এক হাস্যকর জালিয়াতির চিত্র। গরু বোঝাই ট্রাক থামিয়ে দেখা যায়, চালকদের হাতে শোভা পাচ্ছে ‘মাতুরতল বাজার হাটের’ রশিদ। তবে সাংবাদিকদের জেরায় কপালে ঘাম ছুটে যায় চালকদের। অকপটে স্বীকার করেন, গরু লোড হয়েছে অবৈধ ‘পীরের বাজার’ থেকে! আর অলৌকিক এই ‘মাতুরতল রশিদ’ তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন ‘হেলাল ভাই’ নামের এক অদৃশ্য জাদুকর। ততক্ষণে এমন জালিয়াতির স্লিপ বগলে চেপে জনা ৩০-৪০টি ট্রাক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাওয়া হয়ে গেছে।

রাস্তার ম্যাপ আর রশিদের হাটের অবস্থান না মেলায় সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন দাগলেন, “ভাইরে, মাতুরতল তো কলেজের ওপারে! আপনারা বঙ্গবীর পয়েন্ট থেকে উল্টো মুখে কোথায় ধাওয়া করছেন?”—প্রশ্ন শুনেই যাত্রীবেশে থাকা চোরাকারবারিদের গায়ে যেন আগুন লাগল! ভিডিও ক্যামেরায় বাধা আর তোপ দেগে চালিয়াতি ঢাকার চেষ্টা চালাল তড়িঘড়ি।

অনুসন্ধান বলছে, দুই হাটের এই রশিদ-ভেল্কির নেপথ্যে রয়েছে চার চতুর কুতুব—হেলাল উদ্দিন, ফরিদুল, সেবুল এবং ইমাম। অবৈধ গরুকে বৈধে রূপান্তর করে এই চার মূর্তি যেমন কোটি টাকা বগলদাবা করছেন, তেমনি দেশীয় খামারিদের পেটে মারছেন লাথি।

সবচেয়ে রসালো বিষয় হলো—এই মহা-জালিয়াতির নাটকে স্থানীয় প্রশাসনের নিরব দর্শক ভূমিকা! সূত্র বলছে, এই বেপরোয়া রাজত্ব নির্বিঘ্নে চালু রাখতে বড় অঙ্কের ‘মিষ্টিমুখের থলি’ সোজা চলে যায় গোয়াইনঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারীর সিন্দুকে! তবে অভিযোগে বিষয়ে অকপট অস্বীকার রতন কুমার অধিকারীর। তিনি বলেন, চোরাচালানীদের কোন ছাড় নয়, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। 

এদিকে অভিযুক্ত চার কুতুবের একজন সেবুল মিয়া অভিযোগ অস্বীকার করেন। এমনকি তিনি সঙ্গী তিনজনকেও চিনেন না বলে দাবি করেন। 

রাজস্ব ফাঁকি আর হরিলুটের এই তামাশা বন্ধে এখন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে, নাকি ‘পকেটের ভোজ’ এভাবেই চলতে থাকবে—তা দেখতেই প্রহর গুনছে সাধারণ মানুষ!

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad