‘পুষ্পক বিমানম’ নির্মাতা আর নেই

‘পুষ্পক বিমানম’ নির্মাতা আর নেই

প্রথম ডেস্ক

০৪/১০/২০২৬ ১২:২০:২৪

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

ভারতের বর্ষীয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা সিঙ্গীতম শ্রীনিবাস রাও আর নেই। শনিবার রাতে চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন তিনি।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় বেশ কিছুদিন ধরে চিকিৎসাধীন ছিলেন এই কিংবদন্তি নির্মাতা।

তেলুগু সিনেমার অন্যতম ব্যতিক্রমী ও উদ্ভাবনী নির্মাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন সিঙ্গীতম। বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, ফ্যান্টাসি, কমেডি, সামাজিক গল্প কিংবা জীবনীভিত্তিক সিনেমা—কোনো নির্দিষ্ট ঘরানার মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেননি তিনি।

পাঁচ দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে একাধিক ভাষায় নির্মাণ করেছেন ৬০টিরও বেশি সিনেমা।

১৯৩১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর অন্ধ্রপ্রদেশের গুদুরে জন্ম সিঙ্গীতম শ্রীনিবাস রাওয়ের। চলচ্চিত্রে তার পথচলা শুরু কিংবদন্তি নির্মাতা কে ভি রেড্ডির সহকারী হিসেবে। ‘মায়াবাজার’ (১৯৫৭) ও ‘জগদেকা ভীরুনি কথা’ (১৯৬১)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সিনেমার নির্মাণপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।

পরবর্তী সময়ে নিজের চলচ্চিত্রভাষা তৈরিতে এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৭২ সালে ‘নীতি নিজায়িতি’ সিনেমা দিয়ে পরিচালক হিসেবে অভিষেক হয় সিঙ্গীতমের। এরপর একের পর এক ভিন্নধর্মী কাজ দিয়ে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেন তিনি। সামাজিক বাস্তবতা থেকে কল্পনার জগৎ—প্রতিটি সিনেমাতেই নতুন কিছু করার চেষ্টা ছিল তার। ১৯৭৪ সালে নির্মাণ করেন ‘দিক্কাত্র পার্বতী’।

সিনেমাটি তামিল ভাষার সেরা ফিচার ফিল্ম হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। এরপর ১৯৭৭ সালের ‘থারাম মারিন্দি’ তাকে এনে দেয় নন্দী পুরস্কার।

সিঙ্গীতমের উল্লেখযোগ্য কাজের তালিকায় রয়েছে ১৯৮৫ সালের ‘ময়ুরি’। ভারতীয় নৃত্যশিল্পী ও অভিনেত্রী সুধা চন্দ্রনের জীবনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত সিনেমাটিতে অভিনয়ও করেন সুধা। দর্শক-সমালোচকের প্রশংসা পাওয়ার পাশাপাশি একাধিক পুরস্কারও অর্জন করে সিনেমাটি। পরে এটি হিন্দিতে ‘নাচে ময়ুরি’ নামে নির্মিত হয়।

তবে সিঙ্গীতমের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় কাজগুলোর একটি ‘পুষ্পক বিমানম’। কমল হাসান ও অমলা অভিনীত ১৯৮৭ সালের এই সিনেমার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—প্রচলিত অর্থে এতে কোনো সংলাপ ছিল না। শব্দ, অভিনয়, শরীরী ভাষা ও পরিস্থিতির মাধ্যমে গল্প বলেছিলেন নির্মাতা। সংলাপহীন এই সিনেমাটিই পরে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা জনপ্রিয় বিনোদনমূলক ছবির সম্মান অর্জন করে। শুধু তেলুগু নয়, ভারতীয় সিনেমায় পরীক্ষামূলক নির্মাণের অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে আজও আলোচিত ‘পুষ্পক বিমানম’।

সিঙ্গীতমের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে অভিনেতা কমল হাসানের নাম। ‘সোম্মোকাদিদি সোকোকাদিদি’, ‘রাজা পারভাই’, ‘পুষ্পক বিমানম’, ‘অপুর্বা সগোথারাঙ্গাল’ ও ‘মাইকেল মাদানা কামা রাজন’-এর মতো বেশ কয়েকটি সিনেমায় একসঙ্গে কাজ করেছেন তারা।

কমল হাসানের অভিনয়প্রতিভাকে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সিঙ্গীতমের ছিল বিশেষ দক্ষতা। তাদের সিনেমাগুলোতে কমেডি, ব্যঙ্গ, মেকআপ, শারীরিক অভিনয় ও গল্প বলার নানা পরীক্ষার দেখা মিলেছে।

১৯৯১ সালে মুক্তি পায় সিঙ্গীতমের আরেক উচ্চাভিলাষী কাজ ‘আদিত্য ৩৬৯’। নন্দমুরি বালকৃষ্ণ অভিনীত এই সিনেমায় সময়ভ্রমণের গল্প তুলে ধরা হয়। তেলুগু সিনেমায় বিজ্ঞান কল্পকাহিনিনির্ভর নির্মাণের অন্যতম মাইলফলক হিসেবে সিনেমাটি এখনো আলোচিত। এরপর ‘ভৈরব দ্বীপম’-এর মাধ্যমে ফ্যান্টাসির জগতে প্রবেশ করেন তিনি। লোককথা, পুরাণ, অ্যাডভেঞ্চার ও কল্পনার মিশেলে নির্মিত সিনেমাটিও দর্শকের মধ্যে সাড়া ফেলে। বালকৃষ্ণের সঙ্গে তার আরও কয়েকটি কাজ তেলুগু সিনেমায় বিশেষ জায়গা করে নেয়।

তেলুগুর পাশাপাশি কন্নড়, তামিল, হিন্দিসহ একাধিক ভাষার সিনেমায় কাজ করেছেন সিঙ্গীতম। কন্নড়ের কিংবদন্তি অভিনেতা রাজকুমারের সঙ্গেও তার সফল জুটি ছিল। ‘হালু জেনু’, ‘চালিসুভা মোদাগালু’, ‘এর্দু নক্ষত্রাগালু’ ও ‘ভাগ্যদা লক্ষ্মী বারাম্মা’র মতো সিনেমা নির্মাণ করেছেন তারা। রাজকুমারের দুই ছেলে শিবরাজকুমার ও রাঘবেন্দ্র রাজকুমারের চলচ্চিত্রজীবনের শুরুর সঙ্গেও জড়িয়ে আছে সিঙ্গীতমের নাম।

দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনে দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ একাধিক নন্দী পুরস্কার, কর্ণাটক স্টেট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড ও ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড দক্ষিণ পেয়েছেন সিঙ্গীতম। ২০১১ সালে ফিল্ম ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া তাকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড দেয়। পরের বছর পান বি এন রেড্ডি জাতীয় পুরস্কার।

তবে পুরস্কারের বাইরেও সিঙ্গীতমের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তার বৈচিত্র্যময় নির্মাণশৈলী। একই ধরনের সিনেমা বারবার নির্মাণ না করে প্রতিটি কাজেই নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছেন তিনি। একটি সিনেমার সঙ্গে যেন অন্যটির মিল না থাকে, সেদিকেও ছিল তার বিশেষ নজর।

বয়সও থামাতে পারেনি তার সৃষ্টিশীলতা। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালে আবারও পরিচালনায় ফেরেন সিঙ্গীতম। নবীন প্রজন্মের নির্মাতা নাগ অশ্বিনের প্রযোজনায় নির্মাণ করেন তার ৬১তম সিনেমা ‘সিং গীতম’। দীর্ঘদিন ধরে মনে লালন করা একটি গল্প শেষ পর্যন্ত পর্দায় তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।

সিনেমার প্রতি এমন অদম্য ভালোবাসা ও নিরন্তর নতুন কিছু করার আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়েই পাঁচ দশকের বেশি সময়ের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছিলেন সিঙ্গীতম শ্রীনিবাস রাও। তার মৃত্যু ভারতীয় চলচ্চিত্রে এক অনন্য অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাল।

রত্না বাউরী/প্রসি-২৬

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad