৩৫ জন ডাক্তারের স্থলে আছেন মাত্র ৭ জন
বিয়ানীবাজারে মুখথুবড়ে পড়েছে দুই লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবা
সিলেটের সীমান্তঘেঁষা ঐতিহ্যবাহী বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র ও নজিরবিহীন চিকিৎসক সংকটের কারণে সরকারি সাধারণ চিকিৎসাসেবা সম্পূর্ণ মুখথুবড়ে পড়েছে; সরকারি মঞ্জুরীকৃত ও অনুমোদিত ৩৫ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে বর্তমানে হাসপাতালটিতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র হাতে গোনা সাতজন ডাক্তার। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এই সাতজনের মধ্যে স্বয়ং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নিজেই দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন ফাইলপত্র এবং মিটিংয়ের দায়িত্বে সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকায় তিনি নিয়মিত বহির্বিভাগে বসে সাধারণ রোগী দেখতে পারেন না; যার ফলে কার্যত মাত্র ছয়জন চিকিৎসকের ওপর চরম অন্যায়ভাবে নির্ভর করেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে উপজেলার প্রায় দুই লাখ মানুষের নিত্যদিনের জরুরি চিকিৎসাসেবা। চিকিৎসকের এমন ভয়াবহ আকালের কারণে প্রতিদিন বহির্বিভাগে এসে চরম ভোগান্তি ও অবহেলার শিকার হচ্ছেন বিয়ানীবাজারের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরিব রোগীদের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী গোলাপগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলা থেকে আসা হাজার হাজার অসহায় সাধারণ মানুষ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অফিশিয়াল জনবল কাঠামো ও পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ৫০ শয্যার সরকারি এই আধুনিক হাসপাতালে অনুমোদিত ৩৫টি চিকিৎসক পদের মধ্যে জুনিয়র কনসালটেন্ট মেডিসিন, চক্ষু, অর্থোপেডিক্স, ডেন্টাল, স্ত্রী ও প্রসূতি (গাইনি), সার্জারি, নাক-কান-গলা (ইএনটি) এবং অতিপ্রয়োজনীয় আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও)-সহ হাসপাতালের অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মূল পদগুলোই বছরের পর বছর ধরে সম্পূর্ণ শূন্য ও অলস পড়ে রয়েছে; বর্তমানে কর্মরত মাত্র ৬-৭ জন সাধারণ চিকিৎসক দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাকে তিন শিফটে ভাগ করে কোনো রকমে দায়িত্ব পালন করায় অনেক সময় হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, সাধারণ পুরুষ-মহিলা ওয়ার্ড ও কেবিনে ভর্তি থাকা মুমূর্ষু রোগীদের উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে আক্ষরিক অর্থেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি সাপ্তাহিক ছুটি বা কোনো চিকিৎসক ব্যক্তিগত কারণে ছুটিতে থাকলে কিংবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালের ভেতরের চিকিৎসাব্যবস্থা ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং অত্যন্ত জটিল রূপ ধারণ করে। অথচ উল্লেখ্য যে, বিগত বছরগুলোতে প্রসূতি ও নিরাপদ মাতৃত্ব সেবায় পুরো বাংলাদেশের মধ্যে একাধিকবার শীর্ষ ও সেরা উপজেলা হাসপাতালের জাতীয় স্বীকৃতি ও গৌরব অর্জন করেছিল এই বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স; কিন্তু চিকিৎসকের অভাবে গৌরবোজ্জ্বল সেই প্রাচীন সুনাম ও ঐতিহ্য হাসপাতালটি এখন কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারছে না বলে সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সচেতন নাগরিকেরা।
সম্প্রতি হাসপাতাল চত্বরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বহির্বিভাগের সামনে শতশত টিকিটধারী রোগী চিকিৎসকের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মলিন মুখে অপেক্ষা করছেন; হাসপাতালে ভর্তি থাকা নিজের বৃদ্ধা শাশুড়িকে নিয়ে আসা উপজেলার তান্নি বেগম নিজের বুকফাটা ক্ষোভ প্রকাশ করে এই প্রতিবেদককে বলেন, “আমার শাশুড়ির গতকাল থেকে তীব্র ডায়রিয়া ও বমি হচ্ছে, সরকারি ভালো চিকিৎসার আশায় এই সরকারি হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলাম; কিন্তু এখানে কোনো বড় ডাক্তার না থাকায় আমরা ভালো কোনো চিকিৎসা পাচ্ছি না। গতকাল থেকে কেবল ডিউটি নার্সরা এসে স্যালাইন দিয়ে দেখে যাচ্ছেন, কিন্তু রোগীর অবস্থার এখনো কোনো উন্নতি হয়নি; সরকারি হাসপাতালের এই দশা দেখে এখন বাধ্য হয়ে ভাবছি শাশুড়িকে রিলিজ নিয়ে পাশের কোনো প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে ভর্তি করাব।” একইভাবে নিজের পাঁচ বছরের ফুটফুটে কন্যাসন্তান রুমাইজাকে নিয়ে শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা শারমিন বেগম নামের আরেক নারী অত্যন্ত আক্ষেপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিগত দুই দিনে বড় ডাক্তার মাত্র একবার এসে আমার মেয়েকে দূর থেকে দেখে গেছেন, কোনো ওষুধ কাজ করছে না; আগে শুনতাম এই হাসপাতালে অনেক ভালো চিকিৎসা পাওয়া যেত, কিন্তু এখন আর আগের মতো কোনো সেবাই এখানে মিলছে না। আমার মেয়ে এখনো সুস্থ হয়নি, টাকার অভাব সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে তাকে অন্য কোথাও ভালো চাইল্ড স্পেশালিস্ট দেখানোর কথা ভাবছি।” হাসপাতালের বহির্বিভাগে নিজের নিয়মিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের (প্রেসার) সরকারি ওষুধ নিতে আসা প্রবীণ প্রমিলা রোগী মইন উদ্দিন বলেন, “আমি নিয়মিত এই হাসপাতালে ফ্রিতে চেকআপ ও ওষুধ নিতে আসি; আগে হাসপাতালে আসার সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসকরা পরম যত্নে প্রেসার মেপে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরামর্শ দিতেন। কিন্তু আজ সরকারি ছুটির দিন না হওয়া সত্ত্বেও সকাল থেকে লাইনে অপেক্ষা করেও বহির্বিভাগে কোনো ডাক্তারের দেখা পাচ্ছি না, আমাদের গরিবের দুঃখ দেখার কেউ নেই।”
বিয়ানীবাজারের সরকারি স্বাস্থ্য খাতের এই চরম মানবিক বিপর্যয় ও করুণ দশা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বিয়ানীবাজার উপজেলা শাখার সম্মানিত সভাপতি বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমান উদ্দিন সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিয়ানীবাজারের মতো ভৌগোলিকভাবে একটি বিশাল ও প্রবাসী অধ্যুষিত বড় উপজেলার মোট জনসংখ্যা এবং প্রতিদিনের উপচে পড়া রোগীর তুলনায় এত কমসংখ্যক সাধারণ চিকিৎসক দিয়ে কোনোভাবেই একটি আধুনিক ও কার্যকর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা রোগীরা হাসপাতালে এসে পর্যাপ্ত সেবা ও ওষুধ না পেয়ে চোখের জল ফেলে ফিরে যাচ্ছেন, যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আমরা সুজনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই, অবিলম্বে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে এই হাসপাতালে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও আরএমও নিয়োগের স্থায়ী ব্যবস্থা করা হোক, যাতে সাধারণ প্রান্তিক মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা ফিরে পায়।” সরকারি হাসপাতালের এই চরম চিকিৎসক সংকটের নির্মম সত্যতা ও নিজেদের অসহায়ত্বের কথা সরাসরি স্বীকার করে বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ মনিরুল হক গণমাধ্যমের সামনে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “কাগজে-কলমে ৩৫টি পদের বিপরীতে আমাদের এখানে বর্তমানে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন সাধারণ চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন; তারা নিজেদের সাধ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে তিন শিফটে ভাগ হয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করে রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোনো চিকিৎসক হঠাৎ ছুটিতে গেলে বা সাময়িক অসুস্থ হলে হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোরে আসা হাজার হাজার রোগীদের চিকিৎসা দিতে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মারাত্মক ও অবর্ণনীয় সমস্যায় পড়তে হয়; প্রতিদিন বিয়ানীবাজার সদরসহ পার্শ্ববর্তী গোলাপগঞ্জ ও বড়লেখা উপজেলা থেকে হাজার হাজার দরিদ্র রোগী একটু ভালো চিকিৎসার আশায় এখানে আসেন, কিন্তু আমাদের এই সীমিত জনবল ও ওষুধ দিয়ে তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে আমরা সত্যিই হিমশিম খাচ্ছি। এই তীব্র ডাক্তার সংকটের বিষয়টি আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও সিভিল সার্জনকে বারবার মৌখিকভাবে এবং লিখিত জরুরি চিঠির মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে জানিয়েছি, কিন্তু আজ অবধি উপর মহল থেকে শূন্যপদ পূরণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা ডাক্তার বদলি করা হয়নি।”
এ রহমান
মন্তব্য করুন: