চেলা নদীর বালু তোলা কেন্দ্র করে আ’লীগ নেতার 'অডিও বোমা'

দোয়ারাবাজারে ক্ষোভ

চেলা নদীর বালু তোলা কেন্দ্র করে আ’লীগ নেতার 'অডিও বোমা'

নিজস্ব প্রতিনিধি, দোয়ারাবাজার

২৩/০৮/২০২৬ ১৮:১৪:২৭

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

এক সময় ছিলেন রাজমিস্ত্রি, ছিলেন বারকি ও বালু শ্রমিক। কয়েক বছর ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে। প্রবাসের মাটি থেকে দেশে এসেও আবার ফিরেন পুরোনো কাজে। আর এতেই বদলে যায় রাজমিস্ত্রি ও বারকি শ্রমিক স্বপনের ভাগ্য।

বলছিলাম সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও বালু খেকু হাজ্বী স্বপনের কথা। তিনি উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের সারপিন নগর গ্রামের বাসিন্দা মৃত আব্দুল মান্নান এর ছেলে।

সম্প্রতি চেলা নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনে বাঁধা দেওয়ায় নদীর তীরবর্তী গ্রাম সোনাপুরের মানুষদেরকে নিয়ে হুমকি ও গালিগালাজের একটা ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর আবারো সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।

জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বারকি শ্রমিক ও রাজমিস্ত্রী থেকে রাতারাতি শতকোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া বিতর্কিত আওয়ামী লীগ নেতা হাজী স্বপন মিয়ার একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফাঁসের পর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উক্ত অডিওতে তাকে স্থানীয় সোনাপুর গ্রামের আন্দোলনকারী সাধারণ মানুষ এবং তাদের মা-বোনদের নিয়ে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ, অশালীন ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও হুমকি দিতে শোনা যায়। এতে এলাকাজুড়ে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। নিরাপত্তাহীনতায় ভোগছেন বাঁধা প্রদানকারী এসব ব্যক্তি ও পরিবার।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায় , মাত্র এক যুগ (১২ বছর) আগেও স্বপন মিয়া পেশায় একজন সাধারণ রাজমিস্ত্রি ও বারকি শ্রমিক ছিলেন। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় তিনি রাজনৈতিক খোলস বদলে বনে যান ‘মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ’-এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য। এরপর নরসিংপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পঞ্চম স্থান অধিকার করলেও লবিং রাজনীতির মাধ্যমে তাঁর প্রভাব বাড়তে থাকে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, শেখ সেলিম, যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক এমপি নিক্সন চৌধুরীসহ আওয়ামী- যুবলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন মন্ত্রীদের সাথে ছবি ও সেলফি তুলে তিনি এলাকায় নিজের একচ্ছত্র দাপট তৈরি করেন। এই প্রভাব খাটিয়ে তিনি জগন্নাথপুরের মেগা প্রকল্প ‘রানীগঞ্জ ব্রিজ’-এর ব্লকের কাজসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের জেলা ও বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেটে জড়িয়ে বড় বড় ঠিকাদারি কাজ হাতিয়ে নেন এবং শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ভুক্তভোগী জানান, চেলা নদী বালুমহালের কলাবাগান নামক স্থানের উত্তর পাড়ে সোনাপুর গ্রামের সাধারণ মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে সবজি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন। কিন্তু হাজী স্বপন মিয়া ক্ষমতার জোর খাটিয়ে উক্ত এলাকার সরকারি ‘ডিসি খতিয়ান’ ও খাস জমির প্রায় ২০ থেকে ৩০ বিঘা জমি জোরপূর্বক জবরদখল করে নেন। নিজের অবৈধ কালো টাকা আড়াল করতে তিনি স্ত্রী, সন্তান ও মায়ের নামে বিলাসবহুল প্রাসাদ এবং নামে-বেনামে শত শত বিঘা সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন।

সোনাপুরবাসীর অভিযোগ, কিছুদিন আগে লোকদেখানোভাবে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও, নেপথ্যে বিপুল কালো টাকার বিনিময়ে মূল বালুখেকো চক্রের সাথে হাত মেলান স্বপন। দিনের বেলা আইনি ঝামেলা এড়াতে তিনি রাতের আঁধারে নিষিদ্ধ ও পরিবেশ ধ্বংসকারী ‘বোমা মেশিন’ ও ড্রেজার দিয়ে মরা চেলা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন শুরু করেন। এতে নদীভাঙন ও ফসলি জমি বিলীনের আশঙ্কায় বৃহত্তর সোনাপুরের সাধারণ মানুষ রাতের আঁধারে এই অবৈধ ড্রেজার চালানোতে বাধা প্রদান করেন। আর এই বাধা দেওয়ার অপরাধেই ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ স্বপন মিয়া সম্পূর্ণ উত্তর সুরমা ও সোনাপুরবাসীর মা-বোনদের জড়িয়ে অত্যন্ত নোংরা ভাষায় গালিগালাজ করেন, যা বর্তমানে নেটদুনিয়ায় ভাইরাল।

ক্ষমতার পালাবদলে নতুন খোলস ও ‘প্রশাসন ম্যানেজ’ স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ৫ই আগস্ট স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর স্বপন মিয়া কিছুদিন আত্মগোপনে ছিলেন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই তিনি ঢাকায় গিয়ে বিএনপি এবং জোটের কয়েকজন সুবিধাবাদী নেতাকে হাতে নিয়ে আবার নতুন রূপে আবির্ভূত হন। নতুন নেতাদের সাথে সেলফি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে এলাকায় পুনরায় নিজের ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছেন। বর্তমানে তিনি ছাতক সিমেন্ট কারখানার কোটি কোটি টাকার ভাঙারি লোহার সরকারি টেন্ডারে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করছেন, যার কারণে সরকারের বিশাল রাজস্ব থমকে আছে এবং প্রকৃত ব্যবসায়ীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।

এর আগেও ২০২৩ সালে নরসিংপুর ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান নূর উদ্দিন আহমদ স্বপন মিয়ার এই অবৈধ সম্পদ ও বালু লুটের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা দায়ের করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব ও কালো টাকার জোরে চেয়ারম্যানকে ‘ম্যানেজ’ করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। বর্তমানেও তিনি কালো টাকার জোরে স্থানীয় প্রশাসনকে প্রভাবিত করে এবং বিভিন্ন তদবিরের মাধ্যমে মামলার এজাহার থেকে নিজের নাম কাটিয়ে নিয়ে ওপেন বা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ও সাধারণ মানুষকে হুমকি দিচ্ছেন।

প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়ে স্থানীয়রা চেলা ও মরা চেলা নদীর পরিবেশ রক্ষা, দরিদ্র কৃষকদের ফসলি জমি উদ্ধার এবং মা-বোনদের সম্মানহানির বিচারে এই চিহ্নিত বালুখেকো ও জবরদখলকারী স্বপন মিয়ার বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।


মাসুদ রানা সোহাগ / রত্না বাউরি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad