শ্রীমঙ্গল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে হয়রানি, রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধনে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, আয়কর রিটার্নের প্রমাণপত্র (পিএসআর) নিয়ে হয়রানি, জমির মূল্য কম দেখিয়ে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি এবং দলিলে ত্রুটির অজুহাতে অর্থ দাবির অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে জাল দলিলের চেষ্টার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।
স্থানীয় সেবাগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, অফিসকেন্দ্রিক একটি চক্র বিভিন্ন আইনি জটিলতার কথা বলে জমি ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। এতে সেবাগ্রহীতারা হয়রানির শিকার হওয়ার পাশাপাশি সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শ্রীমঙ্গল সাব-রেজিস্ট্রার শংকর কুমার ধর। তাঁর দাবি, তিনি সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে কারও কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেননি।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শ্রীমঙ্গল সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগ দেন শংকর কুমার ধর। এরপর বিভিন্ন ধরনের দলিল নিবন্ধনে সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত ১ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
এসব অভিযোগে তাঁর অপসারণের দাবিতে ২০২৪ সালের ১৯ ও ২০ মার্চ কর্মবিরতি পালন করেন শ্রীমঙ্গল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখকেরা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ চাওয়া হতো। তাঁদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছেলের জন্য ৫ হাজার এবং নাতির জন্য ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
২০২৪ সালে মির্জাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মিছলু আহমেদের একটি দলিল নিবন্ধনের সময় অতিরিক্ত ২৫ হাজার টাকা এবং সাংবাদিক ইসমাইল মাহমুদের এক আত্মীয়ের দলিল নিবন্ধনে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে শংকর কুমার ধর বলেন, ‘আমি যোগদানের পরপরই নতুন ভূমি আইন বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে দলিল লেখক ও জমির মালিকদের সঙ্গে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। জমি নিবন্ধনের আইন প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ও হালনাগাদ হচ্ছে। আমার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ সত্য নয়। আমি সরকারি ফির বাইরে কারও কাছ থেকে বাড়তি কোনো ফি নিইনি।’
সম্প্রতি শ্রীমঙ্গল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমির দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রায় দেড় কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মৌলভীবাজার জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন মো. জসিম মিয়া। অভিযোগের অনুলিপি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং নিবন্ধন পরিদপ্তরের মহাপরিদর্শকের কাছেও পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, শ্রীমঙ্গলের রাধানগরের গৌতম রুদ্র পালসহ তিন ব্যক্তি ২০২০ সালের ৮ জুন ভানু লাল রায়ের কাছে ৪ দশমিক ২৭২৬ একর জমি ৬ কোটি ৪০ লাখ ৮৯ হাজার টাকায় বিক্রির জন্য ১৬২২ নম্বর বায়না দলিল নিবন্ধন করেন। ওই সময় বায়না বাবদ ৬০ লাখ টাকা নেওয়া হয়।
অভিযোগকারীর দাবি, পরবর্তী সময়ে ক্রেতাপক্ষ ও দলিল লেখকের যোগসাজশে জমির শ্রেণি পরিবর্তন ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয় দেখিয়ে সরকারি মৌজা দর বা জমির মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কম দেখানো হয়। এতে সরকারের প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি দলিলে জমির মূল্য কম দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারী জানিয়েছেন, বিষয়টি সরকারি অডিট সংস্থাকেও অবহিত করা হয়েছে।
তবে সাব-রেজিস্ট্রার শংকর কুমার ধর বলেন, ‘জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে যে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, সেটি তদন্ত করা হচ্ছে। তবে বায়না দলিলগুলো ২০২০ সালে নিবন্ধন হয়েছে। আমি যোগদান করেছি ২০২৪ সালে। বায়না নিবন্ধনের তথ্য গোপন রাখা হয়েছিল কি না, তা আমার জানা ছিল না।’
মৌলভীবাজার জেলা রেজিস্ট্রার মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। পরিদর্শনে গিয়ে বিষয়টি তদন্ত করা হবে। সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শ্রীমঙ্গল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র বা পিএসআর নিয়েও সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, পৌরসভা এলাকায় জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে পিএসআর প্রয়োজন—এমন কথা বলে অনেক ক্রেতা-বিক্রেতাকে জটিলতায় ফেলা হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই অর্থের বিনিময়ে দলিল নিবন্ধন করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিধান অনুযায়ী, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৪(৭) ধারায় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায় জমি, বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রয়, হস্তান্তর কিংবা বায়নানামা নিবন্ধনের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র দাখিলের বিধান রয়েছে।
সম্প্রতি শ্রীমঙ্গল শহরের স্টেশন এলাকার বাসিন্দা আতাউর রহমানের স্ত্রী দিলারা বেগম ১০ শতাংশ জমির বায়না নিবন্ধন করতে গিয়ে এ ধরনের সমস্যায় পড়েছেন বলে অভিযোগ করেন।
দিলারা বেগমের দাবি, তাঁর নামে আয়কর সনদ না থাকায় তিনি সমস্যায় পড়েন। এ সময় অফিসের এক কর্মকর্তা তাঁর কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন এবং আয়কর সনদ বা রিটার্ন ছাড়াই বায়না নিবন্ধন করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। পরে দর-কষাকষির পর ৩০ হাজার টাকায় বিষয়টি মীমাংসা হয় বলে তাঁর অভিযোগ।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ৬০ লাখ টাকা মূল্য নির্ধারণ করা ১০ শতাংশ জমির বায়না ৩০ লাখ টাকা মূল্যে নিবন্ধন করা হয়। দলিলটির নম্বর ২৩৫০।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাব-রেজিস্ট্রার শংকর কুমার ধর। তিনি বলেন, ‘পৌরসভা এলাকার জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র প্রয়োজন। তবে টিআইএন সনদ না থাকা সত্ত্বেও একটি দলিল নিবন্ধনের ঘটনা ঘটেছে। গত ৮ জুলাই এনসিপি নেতা প্রীতম দাসের সুপারিশে ওই দলিল সম্পাদন করা হয়েছিল। এ নিয়ে অফিসে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে এ জন্য কোনো টাকা নেওয়া হয়নি।’
দিলারা বেগমের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেদিন তিনি অফিসে ছিলেন না। সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
স্থানীয় সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, পিএসআর ছাড়াও জমির শ্রেণি, মূল্য, দলিলে রাস্তার উল্লেখসহ বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। দলিলে সামান্য ভুল বা সংশোধনের অজুহাতেও ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করার অভিযোগ রয়েছে।
লোটা হোসেন নামে এক সেবাগ্রহীতা বলেন, জমির পাশে ব্যক্তিগত রাস্তা থাকায় সেটি বৈধ করার জন্য তাঁকে ১৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। উত্তরাধিকার সনদের ভিত্তিতে জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও তাঁর কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মো. শাহাব উদ্দিনের অভিযোগ, দলিলে রাস্তার উল্লেখ থাকলেই সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। তাঁর দাবি, এসব অর্থের বিপরীতে কোনো সরকারি চালান জমা হয় না এবং দলিল লেখকের মাধ্যমে ওই অর্থ আদায় করা হয়।
সম্প্রতি শ্রীমঙ্গল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমির দলিল নিবন্ধনের সময় জালিয়াতির বিষয়টি সাব-রেজিস্ট্রারের নজরে আসে বলে জানা গেছে। বিষয়টি টের পেয়ে তিনি একজনকে আটক করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা আরেক ব্যক্তি পালিয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দলিলের নিবন্ধন স্থগিত করা হলেও জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ঘটনার পর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে শ্রীমঙ্গল থানায় ফোন করে পুলিশ ডাকা হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও আটক ব্যক্তিকে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় দলিল লেখক কুমুদ চন্দ্র সরকারের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে।
সাব-রেজিস্ট্রার শংকর কুমার ধর বলেন, ‘রেজিস্ট্রি করতে নিয়ে আসা দালাল বিষয়টি টের পেয়ে পালিয়ে যায়। যাঁকে আটক করা হয়েছিল, তিনি নেহাতই গরিব। দালালের খপ্পরে পড়ে তিনি এ কাজ করতে চেয়েছিলেন। পরে দলিলটি নিবন্ধন করা হয়নি। অভিযুক্তকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং দলিল লেখকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
অভিযোগের বিষয়ে দলিল লেখক কুমুদ চন্দ্র সরকারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বক্তব্য চাওয়া হলে তিনি ফোন কেটে দেন।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: