নবীগঞ্জের টিলা কেটে সরকারি বিদ্যুৎ প্লান্টে মাটি সরবরাহ
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলখ্যাত দিনারপুর পরগনায় আবারও বাণিজ্যিকভাবে পাহাড় ও টিলা কাটা হচ্ছে। স্থানীয় একটি চক্র এসব টিলার মাটি বিক্রি করছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে একটি সরকারি বিদ্যুৎ প্লান্টে। এদিকে পাহাড় ও টিলা কাটায় বাধা দেওয়ায় উপজেলার দেবপাড়া ইউনিয়নের দুই বিএনপি নেতার ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, দিনারপুর পরগনায় সম্প্রতি বাড়ি নির্মাণের অনুমতি নিয়ে একটি চক্র এক্সক্যাভেটর (খনন যন্ত্র) দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে পাহাড় ও টিলা কাটার সময় গত শুক্রবার রাতে স্থানীয় জনতা বাধা দেয়। শনিবার রাতে চক্রটি আবারও টিলা কাটা শুরু করলে নবীগঞ্জ উপজেলার দেবপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট জালাল আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক মুরশেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে এক দল লোক সেখানে গিয়ে বাধা দেন। এসময় ওই চক্রের লোকজন তাদের ওপর হামলা করে।
খবর পেয়ে নবীগঞ্জ থানার গোপলার বাজার পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হয়ে টিলা কাটার কাজ বন্ধ করেন। গতকাল রোববার সকালে নবীগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনিরুদ্ধ দেব রায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় সাংবাদিকদের তিনি জানান, প্রশাসন পাহাড় ও টিলা কাটার অনুমতি দেয়নি। যিনি বাড়ি নির্মাণের জন্য অনুমতি নিয়েছেন, তিনি সেই জায়গায় কাজ না করে অন্য জায়গায় কাজ করেছেন। যে টিলা কেটে মাটি বিক্রি করেছেন, সেটি তাঁর নামে রেকর্ড নেই। আর টিলা কাটার কোনো অনুমতি নেই। তিনি ইউএনওর অনুমতির অপব্যবহার করেছেন।
দেবপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট জালাল আহমদ বলেন, নবীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন টিলা বা পাহাড় কাটার অনুমতি দিতে পারে না। সম্প্রতি এক ব্যক্তি শুধু বাড়ি নির্মাণের জন্য একটি আবেদন করলে জমির শ্রেণি পরিবর্তন না করে পাহাড়ে একটি বাড়ি নির্মাণের অনুমতি দেন ইউএনএ। কিন্তু উক্ত অনুমতিপত্র দিয়ে ওই ব্যক্তি বাণিজ্যিকভাবে টিলা কাটছিলেন। খবর পেয়ে আমরা সেখানে গেলে আমাদের ওপর হামলা করা হয়।
দেবপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুরশেদ চৌধুরী বলেন, দিনারপুর আইনগাঁও এলাকায় আব্দুল আহাদের মেয়ে রুনু বেগমের লোকজন প্রশাসনের নজর এড়াতে শুক্রবার রাতভর এক্সক্যাভেটর মেশিন দিয়ে পাহাড় ও টিলা কেটেছে। শনিবার রাতে দ্বিতীয় দফায় পাহাড় কাটার সময় তারা টিলা কাটতে বাধা দিলে তাদের ওপর হামলা করা হয়। তারা জোরপূর্বক পাহাড় কাটার চেষ্টা করলে পুলিশ এসে কাজ বন্ধ করে। রোববার সকালে নবীগঞ্জ উপজেলার এসি ল্যান্ড এসে টিলা কাটার সত্যতা পেয়ে সম্পূর্ণভাবে কাজ বন্ধ করে দেন।
আইনগাঁও গ্রামের আব্দুল্লাহ বলেন, গ্রামের প্রভাবশালীরা রুনু বেগমের নামে অনুমতি এনে সালেহ, শায়েম, আউয়াল, আশরাফ আলীর তত্ত্বাবধানে স্থানীয় সংঘবদ্ধ চক্র এই পাহাড় থেকে এক্সক্যাভেটর মেশিনের সাহায্যে মাটি কাটছে। পরে ট্রাকভর্তি মাটি বিক্রি করা হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেবপাড়া ইউনিয়নের আইনগাওয়ে নির্মীয়মাণ সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছে। আমরা প্রতিবাদ করলে তারা শুনছে না; উল্টো আমাদের নানা হুমকি দিচ্ছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে রুনু বেগম বলেন, ‘প্রয়োজনে আমার মালিকানাধীন পাহাড় থেকে মাটি কাটছি। এ মাটি পার্শ্ববর্তী বিদ্যুৎ অফিসে (বিবিয়ানা বিদ্যুৎ প্লান্ট- ৩) বিক্রি করছে আমার দেবররা। ব্যবসার জন্য মাটি বিক্রি করা নিষেধ– এটা আমার জানা ছিল না।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) হবিগঞ্জ শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ‘হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ, বাহুবল, চুনারুঘাট ও মাধবপুরে পাহাড়, টিলা কেটে পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রম চলছে বহু বছর ধরে। এতে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। নবীগঞ্জে প্রতিনিয়ত পাহাড় কাটা হলেও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যত কোনো ভূমিকা লক্ষ্য করা যায় না। পাহাড় ও টিলা কেটে মাটি বিক্রিতে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থাসহ পাহাড়-টিলাকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
নবীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনিরুদ্ধ দেব রায় বলেন, ‘রাতে পাহাড় কাটার অভিযোগ পেয়ে কাজ বন্ধ রাখতে বলেছি। রুনু বেগম যদি বাড়ি নির্মাণে অনুমতি নিয়ে তার অপব্যবহার করেন; তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁকে পাহাড় কাটার অনুমতি দেওয়া হয়নি।’
নবীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ আবুল হোসেন বলেন, শনিবার রাতে পাহাড় কাটা নিয়ে দুই পক্ষের মারামারির খবর পেয়ে সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়। সকালে এসি ল্যান্ড গিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়েছেন।
নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা জেরিন বলেন, ঘটনা তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জমির শ্রেণি পরিবর্তন না করার শর্তে শুধু বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য সীমিত পরিসরে মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পাহাড় বা টিলা কাটার কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমাদের টিলা বা পাহাড় কাটার অনুমতি দেওয়ার অধিকার নেই। তিনি যদি প্রশাসনের অনুমতির বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করে থাকেন, তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রত্না বাউরী/প্রসি-২৬
মন্তব্য করুন: