বিশ্বম্ভরপুরে হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটির সভাপতি জিয়া, সম্পাদক ছফির
সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরে হাওরাঞ্চলের উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি-অনিয়ম বন্ধ, ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং নদ-নদী ও জলাশয় দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছে হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন। সংগঠনটির বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা শাখার দ্বিবার্ষিক প্রথম সম্মেলনে বক্তারা এসব দাবি জানান। সম্মেলনে মো. জিয়াউর রহমানকে সভাপতি ও মো. ছফির উদ্দিন টিটুকে সাধারণ সম্পাদক করে ৩৫ সদস্যবিশিষ্ট উপজেলা কমিটি গঠন করা হয়।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় বিশ্বম্ভরপুর অডিটোরিয়ামে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক নুরুল আলম সাগরের সভাপতিত্বে এবং সার্জেন্ট জিয়াউর রহমানের সঞ্চালনায় সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি মো. রাজু আহমেদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা কমিটির সহসভাপতি মো. ওবায়দুল মুন্সী ও সাধারণ সম্পাদক মো. ওবায়দুল হক মিলন।
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, হাওরাঞ্চলের উন্নয়নের নামে কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব মেনে নেওয়া যায় না। বিশেষ করে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারসহ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, কাজের ধীরগতি এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের অভিযোগ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রকল্পের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হচ্ছে কি না এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা সুফল পাচ্ছেন কি না—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
তারা আরও বলেন, হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই হাওরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় মানুষের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকৃত কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা নিশ্চিত করা, দুর্গম এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবার মান বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
বক্তারা হাওরকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাদের মতে, পরিকল্পনাহীন পর্যটন, প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার এবং পরিবেশের ক্ষতি হাওরের জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি প্রকৃতি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও খনিজ সম্পদ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
সম্মেলনে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ, নদ-নদী ও খাল-বিল দখলমুক্ত করা এবং জলাশয় ইজারা প্রক্রিয়ায় অনিয়ম বন্ধের দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল প্রকৃত জেলেদের মৎস্য আহরণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি হাওর ও মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে, যাতে সম্পদের সুফল প্রকৃত উপকারভোগীরা পান।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় হাওর উন্নয়নকেন্দ্রিক যেসব সরকারি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা, কাজের মান নিশ্চিত এবং নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প সম্পন্ন করার দাবি জানান সম্মেলনে অংশ নেওয়া সচেতন নাগরিকেরা। তারা মনে করেন, উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা পূরণ সহজ হবে।
সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে মো. জিয়াউর রহমানকে সভাপতি এবং মো. ছফির উদ্দিন টিটুকে সাধারণ সম্পাদক করে ৩৫ সদস্যবিশিষ্ট বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির সহসভাপতি হয়েছেন বাহা উদ্দিন আহমেদ, হোসাইন আহমেদ, জিয়াউর রহমান, মোবারক হোসেন, মিজানুর রহমান ও সুমন বিশ্বাস। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাদিরুজ্জামান। সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন খালেদ হোসেন ও নবেন্দু পুরকায়স্থ। অর্থ সম্পাদক তারেক তালুকদার।
এ ছাড়া বাঁধবিষয়ক সম্পাদক আবু সুফিয়ান ও ফয়সল আহমদ; দপ্তর সম্পাদক শামীম আহমেদ; প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মিসবাউল হাসান রকি; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক আশরাফুল জাকেরীন; তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক বদরুল ইসলাম; আইন, নারী ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট জোবায়ের রহমান; দুর্যোগ ও ত্রাণবিষয়ক সম্পাদক জিয়াউর হক; পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক সম্পাদক লুৎফুর রহমান টিটু; নদী ও খনিজ সম্পদবিষয়ক সম্পাদক সবুজ মিয়া; হাওর ও কৃষিবিষয়ক সম্পাদক তাম্মিম আরিফ এবং মিডিয়া ও যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম নির্বাচিত হয়েছেন।
নির্বাহী সদস্য হিসেবে রয়েছেন আলমগীর হোসেন, শাকিল আহমেদ, এমদাদুল হক, হৃদয় তালুকদার, মকবুল হোসেন, ইমদাদুল হক ইয়াহিয়া, নাজমুন নুর শ্রেষ্ঠ, আজমান আহমেদ, ইসলাম উদ্দিন, ফয়জুন্নুর ও মাহবুবুর রহমান।
সম্মেলনে বিভিন্ন ইউনিয়ন কমিটির প্রতিনিধি, পরিবেশপ্রেমী এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সচেতন ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
হাওরাঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং কৃষক-জেলেসহ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার দাবি সম্মেলনে গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। তবে এসব দাবি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রীতম দাস/ নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬
মন্তব্য করুন: