পুণ্যভূমিতে পশুর উল্লাস: বিপন্ন শৈশব, রক্তাক্ত বিবেক
এক বুক আশা আর তীব্র এক বিশ্বাস নিয়ে মানুষ আল্লাহর ওলিদের পুণ্যভূমি সিলেটে আসে একটু মানসিক শান্তির খোঁজে, পরম আশ্রয়ের টানে; কিন্তু আমাদের এই পবিত্র, আধ্যাত্মিক নগরী আজ প্রতিনিয়ত কী দেখছে? একের পর এক বিকৃত লালসার শিকার হয়ে রক্তাক্ত হচ্ছে সিলেটের মাটি, যেখানে চলতি মাসেই অন্তত ছয়টি ভয়াবহ ধর্ষণের ঘটনা আমাদের আত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়ে মেরুদণ্ডে তীব্র কাঁপন ধরিয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম অবোধ শিশুর বুকফাটা কান্না কিংবা অসহায় প্রতিবন্ধী কিশোরীর আর্তনাদ হয়তো আমাদের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা পশুটাকে একটু হলেও লজ্জিত করবে, একটু হলেও ভয়ে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য করবে; কিন্তু না, কোনো কিছুতেই এই নরপশুদের থামানো যাচ্ছে না, উল্টো পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণের পৈশাচিক উৎসব।
বাবার হাতে নিজের সন্তান, আপন চাচার লালসার শিকার চার বছরের নিষ্পাপ এক দেবশিশু, মাদরাসা শিক্ষকের অন্ধকার ঘরে নয় মাস আটকে থাকা অবুঝ হাফেজ, প্রতিবন্ধী কিশোরী থেকে শুরু করে দূর থেকে মাজারে আসা এক অসহায় নারী—কেউ রেহাই পাচ্ছে না এই অতলান্ত অবক্ষয়ের চোরাবালি থেকে, যা দেখে আজ তীব্র প্রশ্ন জাগে যে আমাদের সন্তানরা আসলে কোথায় নিরাপদ—ঘরে নাকি বাইরে, নাকি কোথাও না?
এই চেনা সমাজে আমরা কাকে বিশ্বাস করব যেখানে বিশ্বাসের শেষ দেয়ালগুলোও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে, যেমন জৈন্তাপুরের ঘিলাতৈল গ্রামে এগারো বছরের এক অবুঝ শিশু কন্যা তার নিজের জন্মদাতা আকবর হোসেনের লালসার শিকার হয়েছে, যে বাবা হওয়া উচিত ছিল মেয়ের সবচেয়ে বড় সুরক্ষাপ্রাচীর, সেই পাষণ্ডই মায়ের অনুপস্থিতিতে দিনের পর দিন নিজের মেয়েকে ধর্ষণ করেছে, যার চেয়ে বড় নরক আর কিছু হতে পারে না। ঠিক একইভাবে কান্দিগাঁওয়ের সোনাতলা গ্রামে চার বছরের ফাহিমা আক্তারের কোনো দোষ না থাকা সত্ত্বেও আপন চাচা জাকির হোসেন তাকে ফুসলিয়ে ঘরে ডেকে নিয়ে যৌন নির্যাতন শেষে ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করে লাশ ডোবায় ফেলে দিল, যা প্রমাণ করে যে চার বছরের একটা শিশুর দেহও যখন এই পশুদের কামনার বস্তু হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে এই সমাজ শুধু পচেই যায়নি, এর আত্মিক মৃত্যু ঘটেছে।
আবার জকিগঞ্জের ফয়সাল আহমদ কামরান নামের এক শিক্ষক এগারো বছর বয়সী ষোল পারার এক শিশু হাফেজ তাসকিনকে দীর্ঘ নয় মাস একটা ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন চালাল এবং পবিত্র কোরআনের আলোয় আলোকিত এক শিশুর কান্না দীর্ঘ নয় মাস দেয়ালের বাইরে আসতে দিল না এই জালিম, এমনকি শাহজালাল ও শাহপরান (রহ.)-এর মাজারে জিয়ারত করতে আসা এক প্রতিবন্ধী তরুণীকেও সিএনজি চালক আতিকুর, আশিকুর ও শামসুল নামের তিন পশু বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে লোহারপাড়ার এক বাসায় রাতভর গণধর্ষণ করল এবং এর মাত্র কয়েকদিন পরই ১৯ মে বালুচরে আরেক প্রতিবন্ধী কিশোরীও লালসার শিকার হলো, অর্থাৎ যাদের মানুষ অন্ধের মতো বিশ্বাস করে—বাবা, চাচা, শিক্ষক, কিংবা মাজারের আশপাশের চেনা সমাজ—আজ সেই চেনা মানুষগুলোই সবচেয়ে বড় শিকারি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই অন্ধকার কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি, এর পেছনে রয়েছে আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর মানসিকতার চরম বিকৃতি, যেখানে শুধু মুখস্থ শিক্ষা বা লোকদেখানো ধার্মিকতা চলায় মানুষের প্রতি দয়া ও নৈতিকতার মূল শিক্ষা হারিয়ে গেছে এবং শিক্ষকের লেবাসধারী কিংবা পৈশাচিক চরিত্রের মানুষদের আড়ালে এক শ্রেণীর মানুষ চরম বিকৃত মনস্তত্ত্ব লালন করছে, পাশাপাশি অপরাধীরা জানে যে এ দেশে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকায় আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসা সম্ভব, যা অন্য পশুদের আরও সাহসী করে তোলে। তাছাড়া প্রযুক্তির অপব্যবহার, পর্নোগ্রাফি ও হাতের নাগালে মাদকের সহজলভ্যতা তরুণ ও যুবসমাজকে ভেতর থেকে এক একটি হিংস্র পশুতে পরিণত করছে যার ফলে তারা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলোর পবিত্রতা ভুলে যাচ্ছে এবং আমরা চোখের সামনে অন্যায় দেখেও যতক্ষণ না তা নিজের ঘরে আসছে ততক্ষণ মুখ খুলি না, যার প্রমাণ প্রতিবেশীর ঘর থেকে শিশুর কান্নার আওয়াজ পেয়েও দীর্ঘদিন স্থানীয়দের চুপ থাকা, যা অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দেয়।
এই বাসঅযোগ্য সমাজকে যদি আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য একটু হলেও নিরাপদ করতে চাই, তবে শুধু চোখের জল ফেলা বা ক্ষোভ প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়, আমাদের এখনই কঠোর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়ে ফাহিমা, তাসকিন কিংবা জৈন্তাপুরের ওই শিশুর সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিচার সাধারণ নিয়মে বছরের পর বছর চলতে না দিয়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সর্বোচ্চ তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে এই পশুদের প্রকাশ্য ও দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসি নিশ্চিত করতে হবে যেন তা দেখে অন্য কোনো অপরাধীর বুক ভয়ে কেঁপে ওঠে। একই সাথে আমাদের চারপাশে কী ঘটছে তা নিয়ে সচেতন হয়ে পারিবারিক ও সামাজিক নজরদারি বাড়াতে হবে এবং কোনো শিশুর আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখলে বা কোথাও সন্দেহজনক কিছু ঘটলে সাথে সাথে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জানাতে হবে—যেমনটা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করে শিশু তাসকিনকে উদ্ধার করা হয়েছে, সেই সাথে প্রতিটি পরিবারে ছেলেমেয়েদের নৈতিক শিক্ষা দিয়ে নারীদের প্রতি এবং সমাজের সুবিধাবঞ্চিত বা প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখাতে হবে এবং মাজার এলাকা বা জনাকীর্ণ স্থানে অপরাধীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে পুলিশ ও র্যাবের নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে।
সামাজিক অবক্ষয়ের এই কর্দমাক্ত স্রোত যদি আমরা এখনই টেনে না ধরি, তবে আগামী পৃথিবী আমাদের সন্তানদের জন্য এক জীবন্ত জাহান্নাম হয়ে উঠবে, কারণ আজ অন্যের সন্তান ধর্ষিত হচ্ছে বা খুন হচ্ছে বলে যারা নির্বিকার, কাল যে আপনার বা আমার সন্তান এই তালিকার পরবর্তী নাম হবে না তার কোনো গ্যারান্টি নেই, তাই আমাদের বিবেকের এই দীর্ঘস্থায়ী ঘুম এবার ভাঙুক এবং পশুদের আস্তানা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে অবক্ষয়ের এই জোয়ার রুখে দাঁড়িয়ে সমাজকে আবার মানুষের বাসযোগ্য করে তুলতে না পারলে ইতিহাস আমাদের কখনোই ক্ষমা করবে না।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: