চামড়া সংগ্রহ না করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এল কওমি মাদ্রাসা
সিলেটে কোরবানির চামড়া দ্রুত বিক্রির আহবান জেলা প্রশাসকের
আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর মূল্যবান চামড়া অপচয় রোধে তা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার জন্য সিলেটবাসীর প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম; একই সঙ্গে বাজারে কোনো কারণে কেউ চামড়া বিক্রি করতে ব্যর্থ হলে তাৎক্ষণিকভাবে জেলা প্রশাসনকে অবহিত করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেছেন, “সেক্ষেত্রে প্রশাসনের বিশেষ উদ্যোগ ও স্বেচ্ছাসেবকদের সরাসরি সহায়তায় সেই চামড়া সরকারিভাবে সংগ্রহ করা হবে এবং কোনো অবস্থাতেই যাতে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করবে।”
আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) সকালে সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে দেশীয় চামড়া শিল্পের সুরক্ষা ও কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাংবাদিকদের সামনে তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নির্দেশনা তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা প্রশাসক জানান, বিগত বছরগুলোর পরিসংখ্যান বিবেচনা করে এ বছর সিলেট জেলায় কোরবানিকৃত প্রায় ৭০ থেকে ৮৫ হাজার পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহের একটি বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং প্রান্তিক পর্যায়ে চামড়া যাতে পচে নষ্ট না হয়, সেজন্য চামড়া প্রাথমিক সংরক্ষণে সহায়তার উদ্দেশ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দে সিলেট জেলায় ইতোমধ্যে ৩৪৫ টন কাঁচা লবণ বিতরণ ও মজুদ নিশ্চিত করা হয়েছে। পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ঝুঁকির বিষয়টি কঠোরভাবে বিবেচনায় রেখে স্কুল-কলেজ, ছাত্রাবাস, খেলার মাঠ এবং প্রধান প্রধান পর্যটনকেন্দ্রের আশপাশে উন্মুক্ত স্থানে কোরবানি না করার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সিলেটবাসীকে বিনীত অনুরোধ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) এলাকায় কোরবানির পশুর বর্জ্য দ্রুততম সময়ে অপসারণে এবার আধুনিক ও বিশেষ ট্রাশ ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার পর সর্বোচ্চ আট ঘণ্টার মধ্যে পুরো নগরীর বর্জ্য নিখুঁতভাবে অপসারণ করবে সিসিক।”
আয়োজিত এই জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সিলেটের জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধানগণ এবং সিলেটের স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমের কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, অভ্যন্তরীণ চামড়া বাজারে সিন্ডিকেটের কারণে সৃষ্ট তীব্র দরপতন ও বিপুল আর্থিক লোকসানের প্রতিবাদে প্রতিবছরের মতো এবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ না করার যে কঠোর ঘোষণা সিলেটের কওমি মাদ্রাসাগুলো দিয়েছিল, গতকাল সোমবার বিকেলে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে এক জরুরি ও ফলপ্রসূ বৈঠকের পর সেই অবস্থান থেকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে সরে এসেছে। এর আগে, গত ১১ মে এক চাঞ্চল্যকর সংবাদ সম্মেলনে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক শীর্ষ সংগঠন ‘কওমি মাদ্রাসা সংরক্ষণ পরিষদ’ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র, পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অকার্যকর সিদ্ধান্ত এবং বর্তমান নির্বাচিত সরকারের তীব্র উদাসীনতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া সংগ্রহ শেষে তা বিক্রি করতে গিয়ে প্রতিবার বিপুল পরিমাণ লোকসানের অকাট্য প্রসঙ্গ এনে এবার চামড়া বর্জনের এই চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। ওই সময় মাদ্রাসা নেতৃবৃন্দ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেছিলেন যে, বছরজুড়ে সর্বসাধারণের স্বেচ্ছায় দেওয়া দান, মৌসুমী চাঁদা ও কোরবানির পশুর চামড়ার লভ্যাংশই মূলত কওমি মাদ্রাসাগুলো সম্পূর্ণ অরাজনৈতিকভাবে পরিচালনার অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস; কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকার মূলত ২০১৩ সাল থেকেই কওমি মাদ্রাসার এই অন্যতম আয়ের মূল উৎসটি সুকৌশলে বন্ধ করে দিতে এক গভীর অর্থনৈতিক ষড়যন্ত্র শুরু করে এবং ওই সরকারের অসৎ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ক্রমান্বয়ে দেশের রপ্তানি শিল্পের অন্যতম প্রধান শীর্ষ এই চামড়া পণ্য দেশীয় বাজারে নজিরবিহীন দরপতনের শিকার হতে থাকে। শেষপর্যন্ত একসময়ের মূল্যবান কোরবানির চামড়া দেশের বাজারে প্রায় একটি সম্পূর্ণ মূল্যহীন পণ্যে পরিণত হয় এবং বর্তমান মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি এমন এক শোচনীয় পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, কওমি মাদ্রাসাগুলো সাধারণ মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কষ্ট করে কোরবানির চামড়া সংগ্রহ করার পর তা আড়তে নেওয়ার জন্য যত টাকা পরিবহন ও শ্রমিক খরচ করে, পরবর্তীতে আড়তদারদের সিন্ডিকেটের কারণে চামড়া বিক্রি করে সেই যাতায়াত ভাড়ার টাকাও তারা ফেরত পায় না।
সংগঠনটির প্রভাবশালী সদস্যসচিব মাওলানা মুশতাক আহমদ খাঁন তখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সমালোচনা করে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ঐতিহাসিক পতনের পর দেশের নোবেলজয়ী ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চামড়া শিল্প রক্ষায় প্রাথমিক উদ্যোগে কিছুটা রাষ্ট্রীয় তৎপরতা দেখালেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রকৃত সুফল মেলেনি এবং গত বছরের কোরবানির মৌসুমে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কওমি মাদ্রাসাগুলোকে চামড়া সংরক্ষণের জন্য নামমাত্র কাঁচা লবণ সরবরাহ করলেও সেই উদ্যোগটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও মাঠপর্যায়ে অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল। মাদ্রাসা নেতৃবৃন্দের স্পষ্ট দাবি ছিল— ওই সরকারের উচিত ছিল লবণ বিতরণ না করে চামড়া শিল্পের দীর্ঘদিনের দেশীয় ক্ষতিকর বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট কঠোরভাবে ভেঙে দিয়ে কাঁচা চামড়ার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক বাজারে অত্যন্ত মূল্যবান এই চামড়া কাঁচামালকে দেশীয় বাজারে কৃত্রিম মূল্যহীনতার জঘন্য দশা থেকে মুক্ত করতে তদানীন্তন ইন্টেরিম সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, দেশে বর্তমান নতুন সরকার গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায় আসার পর আমরা আশা করেছিলাম চামড়া শিল্পের সেই হারানো সুদিন হয়তো এবার ফিরবে; কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় বর্তমান সরকারের ঘোষিত প্রথম ১৮০ দিনের কোনো বিশেষ অগ্রাধিকার প্রকল্পেই চামড়া শিল্পের মতো রাষ্ট্রের এত বড় একটি বিশাল আয়ের খাত নিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা বা রূপরেখা রাখা হয়নি, এমনকি আগের সেই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটও ভাঙতে পারেনি বর্তমান প্রশাসন, যা কওমি মাদ্রাসাগুলোর শীর্ষ কর্তৃপক্ষকে চরমভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে এবং সার্বিক পারিপার্শ্বিকতা ও লোকসান বিবেচনা করেই মূলত সিলেট বিভাগের কওমি মাদ্রাসাগুলো এবার আগামী কোরবানির মৌসুমে কোনো চামড়া সংগ্রহ না করার কঠোর ও ঐতিহাসিক যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।
তবে উদ্ভূত এই জাতীয় সংকটের মুখে গতকাল সোমবার শেষ বিকেলে সিলেটের জেলা প্রশাসকের বিশেষ আমন্ত্রণে তাঁর কার্যালয়ে এক জরুরি ও দ্বিপাক্ষিক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন ‘কওমি মাদ্রাসা সংরক্ষণ পরিষদ’-এর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং দীর্ঘ বৈঠক শেষে কওমি মাদ্রাসা সংরক্ষণ পরিষদের সদস্যসচিব মাওলানা মুশতাক আহমদ খান সাংবাদিকদের ইতিবাচক সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বলেন, “মাননীয় জেলা প্রশাসকের অত্যন্ত আন্তরিক ও সুনির্দিষ্ট আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে আমরা আমাদের পূর্বঘোষিত চামড়া সংগ্রহ না করার কঠোর সিদ্ধান্ত থেকে সমাজ ও দেশের স্বার্থে সম্পূর্ণ সরে এসেছি; তবে ইতোমধ্যে ঈদের সরকারি বন্ধ ঘোষণা হওয়ায় অনেক মাদ্রাসার সাধারণ ও আবাসিক শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ায় মাদ্রাসাগুলোতে বড় ধরনের জনবল সংকট তৈরি হয়েছে। তাই আমরা বিনীতভাবে সর্বস্তরের সাধারণ নগরবাসীকে অনুরোধ করব, তারা যেন তাঁদের পবিত্র দানের কোরবানির চামড়াগুলো কষ্ট করে নিজস্ব দায়িত্বে নিকটবর্তী কওমি মাদ্রাসায় স্বশরীরে পৌঁছে দেন এবং যেসব মাদ্রাসার আবাসিকে এখনো পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী বা এতিম শিশুরা রয়েছে, তারা ঈদের দিন যথানিয়মে এলাকায় চামড়া সংগ্রহ করবেন।” কওমি মাদ্রাসার আয়ের প্রধান এই উৎসটি সচল রাখার বিষয়ে তিনি আরও যোগ করে বলেন, “চামড়া কেবল মাদ্রাসার আয়ের উৎস নয়, এটি একটি অত্যন্ত মূল্যবান রাষ্ট্রীয় সম্পদ; জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম আমাদের এই ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়টি অত্যন্ত আন্তরিকতা এবং সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিবেচনা করেছেন এবং তিনি আমাদের সুনির্দিষ্টভাবে আশ্বস্ত করেছেন যে, এবার সরকার নির্ধারিত সঠিক দামেই যাতে মাদ্রাসাগুলো আড়তে চামড়া বিক্রি করতে পারে, প্রশাসন তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করবে; এর পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসাগুলোর সংগৃহীত কাঁচা চামড়া আড়তে পরিবহনে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ লজিস্টিক সহযোগিতা এবং চামড়া দ্রুত লবণায়নের প্রক্রিয়ায় দক্ষ লেবার বা শ্রমিক সরবরাহ করা হবে।”
এ রহমান
মন্তব্য করুন: