গোলাপগঞ্জে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পুকুর ভরাট ও মার্কেট নির্মাণ

পরিবেশবাদীদের তীব্র ক্ষোভ ও উচ্ছেদের দাবি

গোলাপগঞ্জে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পুকুর ভরাট ও মার্কেট নির্মাণ

নিজস্ব প্রতিনিধি, গোলাপগঞ্জ

২৬/০৫/২০২৬ ১৯:৩৯:৪৩

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ বাজারে অবস্থিত ঐতিহাসিক জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর বিশালাকার পুকুর সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ভরাট করে বহুতল মার্কেট নির্মাণের বিরুদ্ধে দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের জারিকৃত সুনির্দিষ্ট রুল ও স্থিতাবস্থা (স্টেটাস্কো) আদেশ তোয়াক্কা না করে নির্মাণকাজ দিনরাত অব্যাহত রাখায় তীব্র ক্ষোভ, গভীর উদ্বেগ ও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সিলেটের শীর্ষস্থানীয় পরিবেশবাদী নেতৃবৃন্দ; আদালত অবমাননার শামিল এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে গতকাল সোমবার (২৫ মে) বিকেলে ‘পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট, সিলেট’ এর পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল গোলাপগঞ্জের ঢাকাদক্ষিণের বিতর্কিত ডাকবাংলো পুকুর এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে স্থানীয় প্রশাসনের এমন রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তায় এই তীব্র নিন্দা জানান। উল্লেখ্য, সম্প্রতি ঢাকাদক্ষিণ ডাকবাংলো পুকুরটি জোরপূর্বক মাটি ফেলে ভরাট করে বাণিজ্যিক মার্কেট নির্মাণের মারাত্মক অভিযোগ এনে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী অ্যাডভোকেট খায়রুল আলম জনস্বার্থে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ মহামান্য হাইকোর্টে একটি রিট মামলা দায়ের করলে আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিতর্কিত ওই সরকারি ভূমির ওপর আগামী তিন মাসের জন্য কঠোর স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার পাশাপাশি সব ধরনের অবৈধ নির্মাণকাজ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধের নির্দেশ দেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের মাননীয় বিচারপতি মো. ইকবাল কবির এবং মাননীয় বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ দ্বৈত বেঞ্চ গত বুধবার এক জনাকীর্ণ শুনানিতে এই যুগান্তকারী ও পরিবেশবান্ধব আদেশ জারি করেন। রিটকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট খায়রুল আলম জনস্বার্থে দায়ের করা মামলার আরজিতে আদালতকে সুনির্দিষ্টভাবে জানান যে, সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার দত্তরাইল মৌজায় অবস্থিত প্রাক-ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী সরকারি এই পুকুরটি সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বালু ও মাটি দিয়ে ভরাট করে সেখানে বাণিজ্যিক স্বার্থে বহুতল বিপণিবিতান বা মার্কেট নির্মাণের কাজ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে চলমান রয়েছে, যা দেশের প্রচলিত জলাধার আইন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং সামগ্রিক জনস্বার্থের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ও জঘন্য অপরাধ। এই রিট আবেদনের ওপর প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত এক রুল জারি করে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের কাছে জানতে চেয়েছেন— কেন জনস্বার্থবিরোধী এই সরকারি পুকুরের ওপর অবৈধ মার্কেট নির্মাণকে আইনগতভাবে সম্পূর্ণ বেআইনি ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, কেন চলমান সব ধরনের নির্মাণকাজ স্থায়ীভাবে বন্ধের চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং কেন ঐতিহ্যবাহী পুকুরটিকে ভরাটমুক্ত করে পূর্বের প্রাকৃতিক ও আসল অবস্থায় পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দেওয়া হবে না। এর পাশাপাশি মহামান্য আদালত দেশের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার স্বার্থে স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও জেলা পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ওই পুকুরের সরকারি শ্রেণি পরিবর্তন, মাটি ভরাট কার্যক্রম এবং মার্কেট নির্মাণসংক্রান্ত কথিত অনুমতির বিস্তারিত নথিপত্র ও তথ্যাদি আগামী ৩০ দিনের মধ্যে আবশ্যিকভাবে আদালতে দাখিলের জন্য কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছেন।

হাইকোর্টের এই ঐতিহাসিক আদেশের পরও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় নির্মাণকাজ বন্ধ না হওয়ার খবর পেয়ে ‘পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট, সিলেট’ এর একদল প্রতিনিধি দল আজ ঢাকাদক্ষিণের সেই বিপন্ন পুকুরটি সশরীরে পরিদর্শন করেন। ট্রাস্টের সম্মানিত চেয়ারম্যান প্রবীণ চিকিৎসক ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী (বাহার) এর সরাসরি নেতৃত্বে এই উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শন দলে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ট্রাস্টি ও পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) কেন্দ্রীয় আদায় কমিটির অন্যতম শীর্ষ সদস্য আব্দুল করিম কিম, ট্রাস্টি ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী গোলাম সোবহান চৌধুরী (দীপন), ট্রাস্টি রেজাউল কিবরিয়া, সিলেটের বিশিষ্ট ঐতিহ্য গবেষক আসিফ আজহার, নারী পরিবেশকর্মী রোমেনা রোজী, বিশিষ্ট সংগঠক তাপস পুরকায়স্থ এবং পরিবেশকর্মী নাহিদ পারবেজ বাবু। পরিদর্শন শেষে পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ‘ধরা’র কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল করিম কিম গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, “এর আগে বিগত ২০২০ ও ২০২১ সালেও তৎকালীন জেলা পরিষদের একদল অসাধু কর্মকর্তা ব্যক্তিগত বাণিজ্যের স্বার্থে এই পুকুরটি ভরাট করে মার্কেট নির্মাণের একটি কুৎসিত উদ্যোগ নিয়েছিল; তবে সে সময় ঢাকাদক্ষিণের সচেতন স্থানীয় জনগণ ও সিলেটের আপসহীন পরিবেশবাদীদের তীব্র প্রতিরোধ ও আন্দোলনের মুখে সেই অপচেষ্টা ভেস্তে যায়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, গত ৫ আগস্টের দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির অপসুযোগ নিয়ে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী স্থানীয় ভূমিখেকো সিন্ডিকেট চক্র অতি দ্রুততার সাথে পুনরায় ঐতিহ্যবাহী সরকারি পুকুরটি ভরাট করে মার্কেট নির্মাণের চূড়ান্ত কাজ শুরু করেছে; এবং এই অবৈধ চক্রের সাথে জেলা পরিষদের কিছু চরম দুর্নীতিবাজ ও অসাধু কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ও আর্থিক লেনদেন রয়েছে যা খতিয়ে দেখা দরকার।” ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী প্রকৃতির ভারসাম্য সুরক্ষার ওপর জোর দিয়ে বলেন, “বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যেকোনো প্রাকৃতিক জলাধার বা পুকুর ধ্বংস করে কোনো ধরনের কৃত্রিম স্থাপনা নির্মাণ করা সম্পূর্ণ অবৈধ ও জনস্বার্থের পরিপন্থী; ঢাকাদক্ষিণের স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা এবং অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় এই বিশাল পুকুর ও জলাভূমিটি সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।”

মামলার মূল পিটিশনার ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খায়রুল আলম এই পুকুর ও ভূমির ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরে বলেন, “এই বিশাল সম্পত্তিটি মূলত ঢাকাদক্ষিণের প্রখ্যাত ও দানবীর জমিদার কালী প্রসাদ দত্ত চৌধুরী স্থানীয় সাধারণ জনগণের সার্বিক কল্যাণের কথা বিবেচনা করে তৎকালীন সময়ে চিকিৎসালয় ও জলাধারের জন্য সম্পূর্ণ নিঃশর্তভাবে দান করেছিলেন; সেই দানকৃত পুণ্য ভূমিতে পরবর্তীতে দেশের স্বাধীনতার পর সরকার গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্র, জেলা পরিষদের ডাকবাংলো এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক কোয়ার্টার নির্মাণ করে জনসেবা নিশ্চিত করে আসছিল। কিন্তু অতি সম্প্রতি সম্পূর্ণ ব্যক্তিস্বার্থে ও কিছু মানুষের পকেট ভারী করতে সেই ঐতিহাসিক দানকৃত স্থানে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে পুকুর ভরাট করে মার্কেট নির্মাণ করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না; তাই সচেতন নাগরিক হিসেবে জনস্বার্থ রক্ষায় বাধ্য হয়ে আমি উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি এবং আশা করি আইন অমান্যকারীদের শাস্তি হবে।” ডাকবাংলো পুকুর এলাকা সরজমিনে নিবিড়ভাবে পরিদর্শন শেষে পরিবেশবাদীদের এই প্রতিনিধি দলটি ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের মিলনায়তনে স্থানীয় বিশিষ্ট মুরুব্বি ও সুধীজনদের সাথে এক জরুরি মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম আব্দুর রহিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত মতবিনিময় সভায় উপস্থিত থেকে পুকুরটি রক্ষায় একাত্মতা ঘোষণা করে বক্তব্য রাখেন ঢাকাদক্ষিণের বিশিষ্ট মুরুব্বি শাহ জামাল, কবির আহমদ, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সমাজসেবক মিছবাহ আহমদ, স্থানীয় সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজ আহমদ চৌধুরী, সমাজকর্মী আজিজ খান এবং তরুণ সংগঠক জাবেদ মাহবুব প্রমুখ এবং তাঁরা সকলেই ঐতিহ্যবাহী এই পুকুরটি রক্ষায় যেকোনো কঠোর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

এ রহমান

মন্তব্য করুন: