সিলেটে কোরবানির পশুর হাটে বেচাকেনায় মন্দা : হতাশ বিক্রেতারা

সিলেটে কোরবানির পশুর হাটে বেচাকেনায় মন্দা : হতাশ বিক্রেতারা

প্রথম ডেস্ক

২৬/০৫/২০২৬ ২০:৩৪:৫০

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদের আর মাত্র দুইদিন বাকি থাকলেও সিলেট অঞ্চলের পশুর হাটগুলোতে এখনো আশানুরূপ বেচাকেনা জমে ওঠেনি; হাটে ছোট-বড় ও মাঝারি সাইজের পশুর পর্যাপ্ত রেকর্ড আমদানির অভাব না থাকলেও সেই তুলনায় কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা না আসায় চরম দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা খামারি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। বাজারে ক্রেতার তীব্র খরা ও দরদামে মিল না হওয়ায় লোকসান এড়াতে অনেক খামারিকে বাধ্য হয়ে এক হাট থেকে অন্য হাটে নিজেদের গরু নিয়ে হন্যে হয়ে ঘুরতে দেখা গেছে। খামারি ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি— গত এক বছরে বাজারে সব ধরনের গো-খাদ্যের দাম প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিটি পশুর লালন-পালন ও মোটাতাতাজাকরণ খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে; যার ফলে গত বছরের তুলনায় এবার হাটে গরুর দাম কিছুটা বেশি হাঁকতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। তবে বাজারে আসা সাধারণ ক্রেতাদের প্রত্যাশা— ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে বা শেষ সময়ে এসে লোকসানের ভয়ে খামারিরা পশুর দাম কিছুটা হলেও কমাতে বাধ্য হবেন এবং সেই শেষ সময়ের সুনির্দিষ্ট হিসেব কষে অনেকেই এখন টাকা পকেটে নিয়ে শুধু বিভিন্ন হাট ঘুরে ঘুরে গরু দেখছেন এবং বিক্রেতাদের সাথে দরদাম করে বাজার যাচাই করছেন। গত সোমবার (২৫ মে) ঐতিহ্যবাহী সিলেট নগরীর কাজিরবাজার প্রধান গরুর হাট সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, পুরো হাটজুড়ে হাজার হাজার ছোট-বড় অসংখ্য দেশীয় গরু বাঁশের খুঁটিতে সারিবদ্ধভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে এবং তপ্ত রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ক্রেতারা দল বেঁধে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে ঘুরে নিজেদের পছন্দের গরু দেখছেন ও দাম জিজ্ঞেস করছেন। হাটে উপস্থিত অভিজ্ঞ খামারিরা আক্ষেপ করে বলছেন, বিগত বছরগুলোতে ঈদের অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকেই সিলেটের পশুর হাটগুলোতে পুরোদমে বেচাকেনা জমে উঠেছিল এবং লাখ লাখ টাকার পশু বিক্রি হয়েছিল; কিন্তু এবার ঈদের আর মাত্র দুইদিন বাকি থাকলেও এখনো হাটে সেই উৎসবমুখর ও জমজমাট বেচাকেনার পরিবেশ তৈরি হয়নি, মূলত যারা হাটে আসছেন তারা কেবল দরদাম করেই বাসায় ফিরে যাচ্ছেন। অন্যদিকে হাটে আসা সাধারণ মধ্যবিত্ত ক্রেতারা বলছেন, বাজারে নিজেদের পছন্দসই ও রোগমুক্ত সুস্থ গরু মিললেও বিক্রেতাদের চাওয়া দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় তা কেনা সাধারণের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না; বিশেষ করে বাজারে এবার মাঝারি ও ছোট সাইজের গরুর চাহিদা ও দাম তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি এবং শেষ সময়ে খামারিরা দাম কমিয়ে মাঝারি গরুর বাজার নাগালের মধ্যে আনবেন— এমন প্রত্যাশায় অনেকেই এখনো চূড়ান্তভাবে গরু কিনছেন না।

সিলেট জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে প্রাপ্ত অফিসিয়াল ও সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানা গেছে, এ বছর পুরো সিলেট জেলায় কোরবানির পশুর মোট স্থানীয় চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৩৮টি পশু; তার বিপরীতে স্থানীয় খামারিদের উদ্যোগে জেলায় সম্পূর্ণ সুস্থ ও কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৫টি। অর্থাৎ প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, এবার সিলেটের নিজস্ব পারিবারিক চাহিদা শতভাগ মিটিয়েও প্রায় ৩ হাজার ৯৬৬টি কোরবানিযোগ্য পশু অতিরিক্ত বা উদ্বৃত্ত থাকবে; এ বছর কোরবানি উপলক্ষে সিলেট জেলায় গ্রামীণ পর্যায়ে ৬০টি এবং সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নগর এলাকায় আরও ৭টিসহ জেলাজুড়ে সর্বমোট ৬৭টি পশুর হাটের বৈধ প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ডিজিটাল বাংলাদেশের অংশ হিসেবে কায়িক হাটের পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও ঘরে বসে সহজে পশু কেনাবেচার বিশেষ আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থা সচল রেখেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর; একই সাথে ক্রেতারা যাতে সম্পূর্ণ সুস্থ পশু কিনতে পারেন সেজন্য প্রতিটি অনুমোদিত হাটে পশুর নিখুঁত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ এবং গর্ভবতী গাভি দ্রুত শনাক্তকরণে বিশেষ ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। কাজিরবাজার হাটে নিজের খামারের পশু নিয়ে আসা স্থানীয় খামারি ফারুক মিয়া নিজের কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমার নিজস্ব ডেইরি খামারে কোরবানি দেওয়ার মতো ১০টি উন্নত জাতের গরু রয়েছে, যা আমি প্রায় পাঁচ মাস আগে অনেক টাকা বিনিয়োগ করে কিনেছিলাম; মনে তীব্র আশা ছিল ঈদের আগে সিলেটে এনে ভালো দামে বিক্রি করে কিছু লাভ করতে পারবো, কিন্তু হাটের যে পরিস্থিতি দেখছি তাতে লাভ করা তো দূরের কথা, পশুর পেছনে যে আসল টাকা খরচ হয়েছে তা উঠবে কিনা তা নিয়েই এখন চরম চিন্তায় আছি।’ উত্তরবঙ্গের লালমনিরহাট জেলা থেকে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে কাজিরবাজার হাটে আসা পাইকারি খামারি কুদ্দুস মিয়া বাজারের মন্দাভাব নিয়ে বলেন, ‘বর্তমান বাজারে ভুসি ও খৈলসহ গরু লালন-পালনের যাবতীয় খরচ এক লাফে অনেক বেড়ে গেছে, এরপরও পৈতৃক ব্যবসা ধরে রাখতে ১০টি বড় গরু নিয়ে এই হাটে এসেছি; কিন্তু গত বছরের তুলনায় এবার সিলেটে ক্রেতা অনেক কম এবং যারা আসছেন তারা দাম অনেক কম বলছেন, তাই বিক্রি ও যাতায়াত ভাড়া তোলা নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছি।’ সিলেট বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সম্মানিত পরিচালক ড. আবু জাফর মো. ফেরদৌস সিলেট অঞ্চলের সার্বিক কোরবানি বাজার পরিস্থিতি নিশ্চিত করে পশুর পর্যাপ্ততার বিষয়ে আশ্বস্ত করে বলেন, “এবার পুরো সিলেট বিভাগে কোরবানিযোগ্য পশুর কোনো ধরনের ঘাটতি বা সংকট নেই, বরং আমাদের স্থানীয় চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে; ফলে কোরবানির জন্য সিলেট অঞ্চলের বাইরে থেকে বা সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে কোনো পশু আনার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন হবে না এবং ক্রেতারা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যে তাঁদের পছন্দের পশু কিনতে পারবেন।”


এ রহমান

মন্তব্য করুন: