শাল্লায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় মৃত মানুষ ও কোটিপতি
Led Bottom Ad

শাল্লায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় মৃত মানুষ ও কোটিপতি

নিজস্ব প্রতিনিধি,সুনামগঞ্জ

১৮/০৫/২০২৬ ২০:২৯:০৪

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল হারিয়ে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার হাওরপাড়ের প্রকৃত কৃষকেরা যখন দিশেহারা, তখন সরকারি সহায়তার তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। তালিকায় নাম উঠেছে বছরের পর বছর আগে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের। এ ছাড়া স্বজনপ্রীতি ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধনাঢ্য প্রবাসী, সরকারি চাকরিজীবী, চারতলা বাড়ির মালিক ও খোদ জনপ্রতিনিধিরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। অথচ সহায়তার তালিকায় নাম ওঠেনি ফসল হারানো শত শত প্রকৃত কৃষকের।


স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকদের অভিযোগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ইউনিয়ন পরিষদ সচিবদের গড়ে তোলা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই অনিয়ম করা হয়েছে।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মুক্তারপুর গ্রামের রনু রঞ্জন সরকার গত বছর মারা গেছেন। তাঁর এক ছেলে পুলিশে ও অন্য ছেলে নার্সিংয়ে চাকরি করেন। একই গ্রামের সুধীন চন্দ্র দাসও মারা গেছেন প্রায় ছয় মাস আগে। কিন্তু সরকারি সহায়তার তালিকায় এই দুই মৃত ব্যক্তির নাম রয়েছে। ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মিহির চৌধুরী এই নামগুলো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন বলে অভিযোগ। একই চিত্র শাল্লা ইউনিয়নের সহাদেবপাশা গ্রামেও। সেখানে করফুল নেছা নামের এক নারী চার বছর আগে মারা গেলেও তাঁর নাম রয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায়।


সরকারি সহায়তা পেতে স্থানীয় ইউপি সদস্যরা স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বাহাড়া ইউপি সদস্য মিহির চৌধুরী খোদ নিজের নাম তালিকায় রেখেছেন। এমনকি তিন মাস ধরে ঢাকায় থাকা তাঁর বাবার নামও তালিকায় দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি টাকা পেলে অর্ধেক টাকা ইউপি সদস্যকে দিতে হবে—এমন চুক্তিতে মৃত ও অকৃষকদের নাম তোলা হয়েছে। বাহাড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য দেবব্রত তালুকদার ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাঁর চাকরিজীবী ভাই-বোন ও মা-বাবাসহ পরিবারের অন্তত ১০ জনের নাম ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় ঢুকিয়েছেন। হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদেও প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে ইউপি সদস্য টিপু সুলতান নিজের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন।


ভান্ডাবিল হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক অজয় দাশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এমনও লোক আছে, যাদের এক কেদার জমিও পানিতে তলিয়ে যায়নি, কিন্তু তাদের নাম তালিকায় রয়েছে। এই তালিকা কী করে হলো, বুঝতে পারছি না।’


তালিকায় নাম রয়েছে বাহাড়া গ্রামের বাসিন্দা জগন্নাথ রায়ের, যিনি সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অবসর নিয়েছেন এবং উপজেলা সদরে তাঁর একটি চারতলা বাড়ি রয়েছে। তাঁকে তালিকায় ঢুকিয়েছেন ইউপি সদস্য মধুসূদন দাশ। এ ছাড়া ছেলেমেয়ে সরকারি চাকরি করা রামকৃষ্ণ রায়, রৌওয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আশীষ চৌধুরী এবং দুই ছেলে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা সহাদেবপাশা গ্রামের আপ্তাব উদ্দিনের নামও রয়েছে ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায়।


অথচ মুক্তারপুর গ্রামের প্রকৃত কৃষক শিবেন্দ্র দাস আক্ষেপ করে বলেন, ‘আট কেদার জমি করছিলাম। তিন কেদার কাটছি। বাকি পাঁচ কেদারই পানির নিচে গেছে। কিন্তু তালিকায় আমার নাম নাই।’


এই জালিয়াতির বিষয়ে উপজেলা কৃষক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক একরামুল হক তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শাল্লা উপজেলায় অনেক মৃত ও ধনাঢ্য ব্যক্তির নাম তালিকায় রয়েছে। প্রকৃত কৃষক অনেকে বাদ পড়েছেন। দ্রুত এই ভুয়া তালিকা সংশোধনের দাবি জানান তিনি।


এদিকে তালিকায় জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্মকর্তারা দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। অভিযুক্ত ইউপি সদস্য মিহির চৌধুরী বলেন, ‘আমার নাম অন্যরা দিয়েছে। কিছু মৃত ব্যক্তির নাম থাকতে পারে, তা সংশোধনের জন্য বলেছি।’


যোগাযোগ করা হলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শুভজিৎ রায় মন্তব্য এড়িয়ে বলেন, ‘বন্যা বা দুর্যোগ হলে ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে কাজ করে পিআইও অফিস। এ বিষয়ে আমার বক্তব্য না দেওয়াটাই সমীচীন।’


উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আবু সাঈদ বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার সঙ্গে কথা না বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিন।’


সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, শাল্লা উপজেলায় মৃত ব্যক্তি কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হননি এমন কোনো ব্যক্তির নাম তালিকায় পাওয়া গেলে তা কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা হবে। এ ঘটনায় জড়িত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রীতম দাস/ ডি আর ডি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad