সিংহবাড়িতে কবি নজরুলের পদধূলির শতবর্ষ স্মরণোৎসব রবিবার
Led Bottom Ad

শতবর্ষের আবেগ ও ঐতিহ্যের স্মারক

সিংহবাড়িতে কবি নজরুলের পদধূলির শতবর্ষ স্মরণোৎসব রবিবার

প্রথম ডেস্ক

২৩/০৫/২০২৬ ২১:৩৬:০৭

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

বাঙালি সংস্কৃতির দুই মহাতারকা—বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিধন্য সিলেটের ঐতিহাসিক ‘সিংহবাড়ি’। আজ থেকে ঠিক এক শতাব্দী আগে, ১৯২৬ সালের মে মাসে দ্রোহ ও প্রেমের কবি নজরুল পা রেখেছিলেন সিলেটের এই ঐতিহ্যবাহী প্রাঙ্গণে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে একশোটি বছর। কবি নজরুলের সেই ঐতিহাসিক সিলেট আগমন ও সিংহবাড়িতে আতিথেয়তা গ্রহণের শতবর্ষ পূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখতে আগামীকাল ২৪ মে (রবিবার) আয়োজিত হতে যাচ্ছে এক জাঁকজমকপূর্ণ স্মরণোৎসব।


এই ঐতিহাসিক ক্ষণটিকে বরণ করে নিতে আজ ২৩ মে (শনিবার) বিকেল ৫টায় সিলেট নগরের জিন্দাবাজারস্থ হোটেল গোল্ডেন সিটির কনফারেন্স কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উৎসবের মূল আয়োজক ‘উপেন্দ্র-বীণাপানি স্মৃতি পরিষদ’-এর উদ্যোগে এই সভার আয়োজন করা হয়।

ঐতিহ্য ও ইতিহাসের দায় থেকে মতবিনিময়


মতবিনিময় সভায় উৎসবের পরিপাটি রূপরেখা তুলে ধরে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন উপেন্দ্র-বীণাপানি স্মৃতি পরিষদের সভাপতি জ্যোতির্ময় সিংহ মজুমদার চন্দন। সাংবাদিকদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রকৃত ধারক-বাহক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, "আগামীকাল ২৪ মে রবিবার বিকেল সাড়ে চারটায় আমরা জাতীয় কবির সিংহবাড়ি আগমনের শতবর্ষ স্মরণোৎসব পালন করতে যাচ্ছি। মূলত ঐতিহ্য, চেতনা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক গভীর দায়বদ্ধতা থেকেই আমাদের এই আয়োজন। আপনাদের মূল্যবান পরামর্শ ও সহযোগিতা এই অনুষ্ঠানকে আরও সার্থক করে তুলবে।"


তিনি আবেগঘন কণ্ঠে স্মরণ করেন যে, সিংহবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল—দুজনেরই পদধূলি পড়েছিল, যা কেবল একটি পরিবারের জন্য নয়, বরং সমগ্র সিলেটবাসীর সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।


ইতিহাসের পাতা উল্টে জ্যোতির্ময় সিংহ মজুমদার চন্দন জানান, ১৯২৬ সালে কবি নজরুল যখন অসুস্থ শরীরে সিলেটে অবস্থান করছিলেন, তখন সিংহবাড়ির সদস্যদের পরম মমতা, আন্তরিক সেবা ও ভালোবাসা কবিকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। সেই মানবিক সম্পর্কের এক অদ্ভুত সুন্দর ও উজ্জ্বল সাক্ষী হয়ে আছেন সিংহবাড়ির কন্যা লীলাবতী মজুমদার। কবির আপন জ্যেঠতুতো বোন লীলাবতীর সুরেলা কণ্ঠে গান শুনে মুগ্ধ ও বিমোহিত হয়ে কবি নজরুল তাৎক্ষণিকভাবে রচনা করেছিলেন এক হৃদয়ছোঁয়া কবিতা:


    "তোমার কণ্ঠে বাঁধিয়াছে নীড় সুরের দেশের পাখি—

    সুরেশ্বরের হস্তে বাঁধুক তোমার সুরের রাখী।

    উষসীর বাণী এনেছো বহিয়া আকুল কণ্ঠে পুরে

    ফুলঝুরি সম তৃষিত ধরায় পড়ুক তাহাই ঝরে।

    হেম-গিরি তলে কাঁদে যে নির্ঝর

    প্রকাশের পথ খুঁজি,

    তোমার কণ্ঠে শুমরিছে আজো তারি আকুলতা বুঝি!"


নতুন প্রজন্মের দূরত্ব ও সংস্কৃতির সংকট নিয়ে আক্ষেপ

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত বক্তারা জাতীয় কবির গুণগাথা স্মরণ করে বলেন, নজরুল যেমন বিদ্রোহের কবি, তেমনি প্রেম, সাম্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবমুক্তির কবি। তবে বর্তমান সময়ের সাংস্কৃতিক সংকট নিয়ে গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে তাঁরা বলেন, আমরা আজ এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে প্রযুক্তির জোয়ারে মানুষ তার নিজস্ব ইতিহাস ও শিকড় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুল আজ কেবলই পাঠ্যবইয়ের একটি অধ্যায় মাত্র। অথচ তাঁর সাহিত্য ও সংগীতের যে দ্রোহ ও মানবতার শিক্ষা, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বাণিজ্যিক বিনোদনের চাপে যখন শুদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, তখন স্থানীয় পর্যায়ের এই ধরনের আয়োজন সমাজকে নতুন করে আলোর পথ দেখাবে বলে বক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।


শিকড়সন্ধানী ও আবেগঘন এই মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন গদ্যলেখক ও শিক্ষক সঞ্জয় কুমার নাথ, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা শিলা সাহা, শিক্ষিকা শাশ্বতী ঘোষ সোমা এবং জয়তী ঘোষ লুনা প্রমুখ। এছাড়াও অনুষ্ঠানে জাতীয় দৈনিক ‘প্রথম আলো’ ও ‘দৈনিক কালবেলা’-এর সিলেট প্রতিনিধিসহ জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত হয়ে অনুষ্ঠানকে সাফল্যমণ্ডিত করতে তাঁদের সংহতি প্রকাশ করেন।


আগামীকালের এই শতবর্ষ স্মরণোৎসব সিলেটবাসীর জন্য কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এক শতাব্দী আগের হারিয়ে যাওয়া সোনালী অতীত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখার এক পরম আবেগঘন মুহূর্ত।

ডি আর ডি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad