কুলাউড়ার সড়কে মরা গাছ যেন ‘ডেথ ট্র্যাপ’
সবুজ পাতার ছায়া দিয়ে যে গাছগুলো একদিন পথচারীদের ক্লান্তি দূর করতো, আজ তারাই যেন একেকটি জীবন্ত ‘আজরাইল’ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সড়কের পাশে। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ব্যস্ততম সড়কগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত মরা গাছ এখন রূপ নিয়েছে একেকটি মরণ ফাঁদে। যেকোনো মুহূর্তে মাথার ওপর মস্ত বড় শুকনো ডাল কিংবা আস্ত গাছ ভেঙে পড়ে ঝরে যেতে পারে তাজা প্রাণ—এমন এক বুক আতঙ্ক আর চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করছেন হাজারো মানুষ।
ছায়া দেওয়া গাছ যখন ঘাতক:
মৌলভীবাজার, কুলাউড়া ও জুড়ী উপজেলার সংযোগকারী প্রধান সড়কের দুই পাশে বহু বছর আগে সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়েছিল হাজার হাজার আকাশমণি গাছ। সময়ের বিবর্তনে রোগাক্রান্ত হয়ে কিংবা অযত্নে আজ সেই গাছগুলোর পাতা ঝরে কঙ্কালসার রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে গাছগুলো মরে কাঠ হয়ে থাকলেও তা কাটার বা অপসারণের কোনো উদ্যোগ নেয়নি কর্তৃপক্ষ। ফলে, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের এই সময়ে সামান্য ঝড়-বাতাস কিংবা কালবৈশাখীর ঝাপটা এলেই মটমট করে ভেঙে পড়ছে গাছের ভারী ডালপালা। প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে ছোটখাটো দুর্ঘটনা, রক্তাক্ত হচ্ছেন পথচারী।
ঝরেছে প্রাণ, তবুও কাটেনি ঘুম:
এই মরণ ফাঁদ যে শুধু আতঙ্ক, তা নয়; ইতিপূর্বে এই উদাসীনতা কেড়ে নিয়েছে তরতাজা প্রাণও। স্থানীয়রা ক্ষোভ ও বেদনার সাথে স্মরণ করেন নাছনী এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মুহিদ সুবিদের কথা। কুলাউড়া মিশন এলাকায় রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ওপর থেকে মরা গাছের ডাল ভেঙে পড়ে ঘটনাস্থলেই নির্মম মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। একটি মৃত্যুর পরও প্রশাসনের ঘুম না ভাঙায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
ব্রাহ্মণবাজার রুটের সিএনজি চালক আমিরুল হোসেন তাঁর বুক কাঁপানো অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, "প্রতিদিন জীবনটা হাতের মুঠোয় নিয়ে এই রাস্তায় গাড়ি চালাই। কয়েকদিন আগের ঝড়ে চোখের সামনে একটা বিশাল ডাল ভেঙে পড়ল, একটুর জন্য আল্লায় বাঁচাইছে। এখন এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ওপরের দিকে তাকিয়ে আল্লার নাম জপতে জপতে যাই।"
দায়িত্ব এড়ানোর চোর-পুলিশ খেলা:
মৃত্যুর এই আয়োজন নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের মুখে কেবলই আশ্বাস আর ‘চিঠি চালাচালি’র চিরাচরিত গল্প। ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম স্বীকার করলেন জনদুর্ভোগের কথা। তিনি বলেন, "মানুষ সত্যিই খুব ঝুঁকি নিয়ে চলছে। আমি গাছগুলো কাটার জন্য দ্রুত প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করব।"
এদিকে, মৌলভীবাজার সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কায়সার হামিদ পুরো দায় বন বিভাগের ওপর চাপিয়ে দিয়ে বলেন, "আমরা বন বিভাগকে এই বিষয়ে চিঠি দিয়েছি, কিন্তু এখনো কোনো জবাব পাইনি। তবে জেলা প্রশাসকের সাথে কথা হয়েছে, মরা গাছগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
অন্যদিকে, কুলাউড়া উপজেলার নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা আক্তার জানান, তিনি সম্প্রতি এখানে যোগদান করেছেন এবং বিষয়টি কেবল তাঁর নজরে এসেছে। খোঁজ নিয়ে তিনি দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর চিঠি চালাচালির এই বৃত্তে বন্দী হয়ে আছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা।
স্থানীয়দের একটাই প্রশ্ন—প্রশাসনের এই ঘুম ভাঙতে আর কতটি তাজা প্রাণের আহুতি প্রয়োজন? কুলাউড়াবাসীর দাবি, আর কোনো অকাল মৃত্যু বা কান্নার রোল ওঠার আগেই অনতিবিলম্বে সড়কপাশের এই মরণ ফাঁদগুলো কেটে অপসারণ করা হোক।
হিফজুর রহমান / ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: