ব্যাপক ক্ষোভ, ঘটনার পর কর্মচারী বদলি
সিলেটে ইউএনও-কে ‘আপা’ সম্বোধন করায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানার অভিযোগ
সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার নবনিযুক্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুনমুন নাহার আশাকে সরকারি পদের পরিবর্তে সাধারণ গ্রামীণ ভাষায় ‘আপা’ বলে সম্বোধন করায় ক্ষুব্ধ হয়ে অভিজাত মিষ্টি বিপণন প্রতিষ্ঠান ‘বনফুল অ্যান্ড কোম্পানি’-এর তাজপুর শাখার এক সাধারণ কর্মচারীকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করার এক চাঞ্চল্যকর ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে; এই নজিরবিহীন ঘটনার পর ওই নিরীহ কর্মচারীকে প্রথমে চাকরিচ্যুত এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে চাকরি ফিরে পেলেও শাস্তিস্বরূপ সিলেট কারখানায় বদলি করা হয়েছে।
স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্র ও ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগ থেকে জানা গেছে, গত ২৯ মে (২০২৬) পবিত্র ঈদুল আজহার পরদিন বিকেলের দিকে নিজের শিশু কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে সাধারণ ক্রেতার ছদ্মবেশে তাজপুর বাজারে অবস্থিত বনফুলের শোরুমে যান ইউএনও মুনমুন নাহার আশা; সে সময় শোরুমের শাখা ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়া দোকানের বাইরে ব্যক্তিগত কাজে অবস্থান করছিলেন। দোকানে থাকা ২৬ বছরের পুরোনো ও হার্টের রোগী আব্দুল মান্নান নামের এক সাধারণ কর্মচারী ক্রেতার বেশে থাকা ইউএনও-র কাছে চকোলেট আইসক্রিম চাইলে তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জানান যে এই মুহূর্তে চকোলেট ফ্লেভারের আইসক্রিম স্টকে নেই, তবে অন্য কোনো ফ্লেভারের আইসক্রিম তিনি নিতে পারেন; পরবর্তীতে ইউএনও মিষ্টির কাউন্টারে গিয়ে সাজিয়ে রাখা বিভিন্ন মিষ্টির গুণগত মান ও তা তাজা কি না জানতে চাইলে সরল বিশ্বাসে আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আপা, গতকাল ঈদের ছুটির কারণে আমাদের কারখানায় নতুন মিষ্টি তৈরি হয়নি বা নতুন কোনো চালান আসেনি, আজকের ভালো মিষ্টিগুলো দুপুরের মাঝেই বিক্রি হয়ে গেছে। এগুলো মূলত শুকনো মিষ্টি, দুই-চার দিন ফ্রিজের বাইরে থাকলেও সহজে নষ্ট হয় না।’
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ অনুযায়ী, একজন সাধারণ দোকানদারের মুখ থেকে ‘আপা’ সম্বোধনটি শোনামাত্রই চরম ক্ষিপ্ত ও অহংকারে ফেটে পড়েন ইউএনও মুনমুন নাহার আশা এবং তিনি চিৎকার করে আব্দুল মান্নানকে শাসিয়ে বলেন, ‘তুমি আমাকে চিনো? আমাকে আপা ডাকছ কেন? আমি এই উপজেলার ম্যাজিস্ট্রেট! তোমাদের বিরুদ্ধে বাসি মিষ্টি ও পচা খাবার বিক্রির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পার্শ্ববর্তী বালাগঞ্জ উপজেলার ইউএনওসহ অনেকেই আমার কাছে সরকারিভাবে দিয়েছে; আমি এখনই এখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে তোমাদের দোকান সিলগালা করব।’ এরপর তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে শোরুমের ম্যানেজারকে তলব করার নির্দেশ দেন; কর্মচারী তখন ম্যানেজার বাইরে আছেন জানালে ইউএনও আরও ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে পুলিশে দেওয়া এবং দীর্ঘ মেয়াদে জেল ও বড় অঙ্কের জরিমানার ভয় দেখাতে শুরু করেন।
আব্দুল মান্নানের দাবি, পুলিশের গাড়ি ডাকার হুমকিতে তীব্র মানসিক চাপ ও হার্টের অসুখ থাকায় একপর্যায়ে তিনি অজ্ঞান হওয়ার উপক্রম হলে দোকান থেকে সরে যান; পরে ম্যানেজার সুহেল বড়ুয়া দ্রুত শোরুমে এসে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ইউএনও-র পায়ে হাত দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এরপর রাজস্ব আদায়ের নামে একটি পূর্বনির্ধারিত সরকারি জরিমানা আদায়ের রসিদ বা সাদা কাগজে স্বাক্ষর করার জন্য আব্দুল মান্নানকে ডেকে আনা হয়; মান্নান প্রথমে না বুঝে স্বাক্ষর করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানালে তাকে ৬ মাসের কারাদণ্ড ও লক্ষাধিক টাকা জরিমানার ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক স্বাক্ষর ও টিপসই আদায় করা হয়। গত ১ জুন (সোমবার) সরকারি অফিস খোলার দিন বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ কর্মচারী আব্দুল মান্নান নিজের চাকরি বাঁচাতে ও জরিমানার বিশাল পরিমাণ কমানোর আকুল অনুরোধ জানাতে কাঁদতে কাঁদতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে যান এবং সেখানে উপস্থিত উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সামনে হাতজোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন; কিন্তু ইউএনও তাঁর কান্নাতেও বিন্দুমাত্র সাড়া না দেওয়ায় নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগী কর্মচারী সিলেট-২ (ওসমানীনগর-বিশ্বনাথ) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনার বাসভবনে গিয়ে তাঁর শরণাপন্ন হন এবং প্রশাসনের এমন নগ্ন বলপ্রয়োগের বিষয়টি দেখার জন্য লিখিত অনুরোধ জানান।
দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে বনফুলে অত্যন্ত সততার সাথে চাকরি করা আব্দুল মান্নান অশ্রুসিক্ত চোখে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘চাকরি জীবনে বহু ভিআইপি ক্রেতা দেখেছি, কিন্তু শুধু আপা ডাকার অপরাধে এমন পৈশাচিক ও পরিকল্পিত হ্যারাজমেন্টের শিকার কখনও হইনি; ঘটনার পর দিনই বনফুল কর্তৃপক্ষ প্রশাসনের ভয়ে আমাকে চাকরিচ্যুত করেছিল, পরে বিএনপির নেতাদের অনুরোধে চাকরি রক্ষা পেলেও আমাকে শাস্তিস্বরূপ তাজপুর থেকে বদলি করে সিলেটের প্রধান কারখানায় পাঠানো হয়েছে এবং জরিমানা বাবদ দেওয়া ৫০ হাজার টাকার পুরো অর্থ আমার মাসিক বেতন থেকে প্রতি মাসে কেটে নেওয়া হবে বলে কোম্পানি আমাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে।’ ভুক্তভোগী কর্মচারীর আরও গুরুতর অভিযোগ, প্রশাসনের এই ক্ষমতার অপব্যবহারের মূল ঘটনাটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে এবং বাসি মিষ্টির গল্প সাজাতে বনফুলের স্থানীয় ম্যানেজার সুহেল বড়ুয়াকে ইউএনও-র কার্যালয় থেকে পূর্বনির্ধারিত বা ‘শেখানো’ বক্তব্য মিডিয়ার সামনে দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ওসমানীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস.টি.এম. ফখর উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, অসহায় কর্মচারীটি কান্নাকাটি করতে করতে সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনার কাছে নালিশ নিয়ে গিয়েছিলেন এবং এমপি মহোদয় স্বয়ং ভুক্তভোগীর মুখে পুরো নির্মম ঘটনাটি শুনেছেন; তবে প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার এমন আচরণ দুঃখজনক। অন্যদিকে বনফুল তাজপুর শাখার ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়া অসহায় কণ্ঠে বলেন, ‘আমাদের কর্মচারী আব্দুল মান্নান বয়স্ক ও সম্পূর্ণ নিরক্ষর হওয়ায় ক্রেতার বেশে আসা ইউএনও মহোদয়কে চিনতে পারেননি; আর এ কারণেই ম্যাডাম প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে তাৎক্ষণিক স্পটেই ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন, যা কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী কর্মচারীর বেতন থেকেই সমন্বয় করতে হচ্ছে।’ ঘটনার বিষয়ে জানতে পার্শ্ববর্তী বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত পেশাদার ভঙ্গিতে বলেন, ‘ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমার সহকর্মী; তবে শুধু ‘আপা’ ডাকার কারণে একজন নাগরিককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করার কোনো আইনি বিধান মোবাইল কোর্ট অ্যাক্টে নেই, হয়ত তিনি মিষ্টির দোকানে অন্য কোনো বড় কারিগরি অনিয়ম দেখতে পেয়ে জরিমানা করেছেন।’ এই নজিরবিহীন ও সংবেদনশীল বিষয়ে সরাসরি বক্তব্য জানতে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনমুন নাহার আশার সরকারি ও ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও গণমাধ্যমকর্মীদের ফোন বুঝতে পেরে তিনি প্রতিবারই লাইন কেটে দেন এবং ফোন রিসিভ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকেন।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: