'ফুটবল মায়ায়' কাঁপছে সিলেট: সবখানেই উড়ছে প্রিয় দলের রঙিন পতাকা

'ফুটবল মায়ায়' কাঁপছে সিলেট: সবখানেই উড়ছে প্রিয় দলের রঙিন পতাকা

তাহির আহমদ

১১/০৬/২০২৬ ১৪:০৬:১৫

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

ভৌগোলিক মানচিত্রে দূরত্বটা প্রায় হাজার হাজার মাইলের। কিন্তু জুনের এই তপ্ত রোদে কিংবা মেঘ-বৃষ্টির সিলেটে এসে দাঁড়ালে সেই দূরত্বের সীমানা যেন এক নিমেষেই মিলিয়ে যায়। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশ নিয়ে বসতে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মহোৎসব ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬’। আর এই গ্রেটেস্ট শো অন আর্থকে কেন্দ্র করে চায়ের দেশ সিলেটে এখন রূপ নিয়েছে এক টুকরো লাতিন আমেরিকা কিংবা ইউরোপে! মাঠে বল গড়ানোর আগেই অলিগলি, পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে বহুতল ভবনের ছাদ—সবখানেই এখন উড়ছে প্রিয় দলের রঙের রঙিন স্বপ্ন।


সিলেটে ফুটবল মানেই এক আদিম ও অকৃত্রিম আবেগ। আর সেই আবেগের দুই মেরুতে বরাবরের মতোই রাজত্ব করছে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা। শাবিপ্রবি, সিকৃবি, এমসি কলেজের ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে পাঠানঠুলা, মদিনা মার্কেট, জিন্দাবাজার কিংবা শাহপরানের প্রতিটি দেয়ালে, বারান্দায় শোভা পাচ্ছে প্রিয় দলের পতাকা।


নগরের ক্রীড়াসামগ্রীর দোকান থেকে শুরু করে ফুটপাতের অস্থায়ী স্টল—সবখানেই এখন ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। দেদারসে বিক্রি হচ্ছে মেসি-নেইমারদের জার্সি।


নগরের সোবহানীঘাটের বাসিন্দা আবদুল মজিদ বলেন-বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিলকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা। ব্রাজিলের আক্রমণাত্মক ফুটবল সবসময় আমাকে মুগ্ধ করে। খেলা শুরু হওয়ার আগেই বাসার ছাদে ব্রাজিলের পতাকা টানিয়েছি। আশা করি এবার সেলেসাওরা হেক্সা মিশন পূর্ণ করবে।


একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী দেবদ্যুতি প্রণমী জানায়- "ছোটবেলা থেকেই আর্জেন্টিনার সমর্থক আমি। বিশ্বকাপ এলেই অন্যরকম এক ভালোলাগা কাজ করে। এবারও মেসিদের উত্তরসূরিদের পায়ে জাদুকরী ফুটবল দেখার অপেক্ষায় আছি।"


এদিকে এবারের ফুটবল উন্মাদনা শুধু পতাকা আর জার্সিতেই সীমাবদ্ধ নেই, রূপ নিয়েছে এক অন্যরকম প্রতিযোগিতায়। জিন্দাবাজার ও বন্দরবাজারের ডিজিটাল প্রিন্টিংয়ের দোকানগুলোতে এখন দম ফেলার ফুসরত নেই ব্যবসায়ীদের। ঈদ বা নির্বাচনের মৌসুমের মতোই দিন-রাত জেগে চলছে ২০ থেকে ২৫ ফুট, এমনকি সমর্থকদের চাঁদায় ১০০ ফুট লম্বা ব্যানার তৈরির কাজ। যেখানে প্রিয় তারকার ছবির পাশাপাশি জায়গা করে নিচ্ছে পাড়ার চেনা মুখগুলোর হাসিমুখ।


ব্রাজিল সমর্থক রাহিন ও সুহান জানান, এলাকার প্রায় ১০০ জন মিলে টাকা তুলে বিশাল ব্যানার তৈরি করছেন প্রিয় দলকে শুভেচ্ছা জানাতে। আর আর্জেন্টিনার ইমরান ও সজিবের ভাষায়, "বন্ধুরা মিলে জমানো টাকা দিয়ে ব্যানার বানাচ্ছি। এলাকার ছোট-বড় সবার মাঝে অন্যরকম এক উৎসবের আমেজ।"


বিশ্বকাপের জোয়ার লেগেছে ইলেকট্রনিক্স বাজারগুলোতেও। নতুন টেলিভিশন কেনা কিংবা পুরনোটি মেরামত করার ধুম পড়েছে। সাধারণ মানুষের এই আবেগকে রাঙিয়ে দিতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।


এদিকে নগরবাসীকে খেলা উপভোগের সুযোগ করে দিতে সিসিক প্রশাসক ও বিসিবি পরিচালক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী (যিনি নিজেও একজন ব্রাজিল সমর্থক) জানিয়েছেন, বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে এলইডি মনিটরের মাধ্যমে খেলা দেখানোর ব্যবস্থা করা হবে, যেন গভীর রাতেও ফুটবলপ্রেমীরা একসাথে উৎসব করতে পারেন।


যে দেশে ফুটবল নিয়ে এতা উন্মাদনা, সে দেশে সকলের মনে একটি বিষাদও লুকিয়ে আছে। তাদের বক্তব্য- "২০ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। অথচ আমরা এখনো বিশ্বকাপে খেলতে পারিনি। অনেকেই বিদেশী পতাকার পাশে আমাদের লাল-সবুজের পতাকাও ওড়ান, যা দেশের প্রতি ভালোবাসা। তবে আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের ফুটবলের উন্নয়ন, যেন একদিন নিজেদের জাতীয় দলকে বিশ্বমঞ্চে সমর্থন করতে পারি।"


একই সুর শোনা গেল বাসদ সিলেট জেলার আহ্বায়ক আবু জাফরের কণ্ঠেও। আর্জেন্টিনার সমর্থক এই রাজনৈতিক নেতা বলেন, "কোটি কোটি মানুষের আবেগ জড়িয়ে আছে এই খেলায়। খেলাধুলা সবসময় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হওয়া উচিত। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্মাদনা যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং এটি যেন শুধুই আনন্দের উৎসব হয়।"


বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি এক মিলনমেলা। সিলেটের সচেতন মহলের প্রত্যাশা—মাঠের ভেতরের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন মাঠের বাইরে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা, মারামারি কিংবা সামাজিক কলহ তৈরি না করে। মীরাবাজারের বাসিন্দা সুমন আহমদের কথায়, "পতাকা, জার্সি আর সমর্থকদের এই উচ্ছ্বাস দেখে মনে হচ্ছে খেলা শুরু হওয়ার আগেই আমাদের ঘরে বিশ্বকাপ চলে এসেছে।"


সবুজ পাহাড় আর চায়ের দেশে এই ফুটবল জোয়ার ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে নিয়ে আসুক অনাবিল আনন্দ ও সৌহার্দ্য—এটাই এখন সিলেটবাসীর একমাত্র কামনা।


তানজুমা তাবাসসুম

মন্তব্য করুন: