হাকালুকি হাওরের বুনো ফুল — প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্যের জীবন্ত ভাষা
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি হলো হাকালুকি হাওর। এশিয়ার বৃহত্তম হাওরগুলোর অন্যতম এই বিস্তীর্ণ জলাভূমি সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলাজুড়ে নীরবে বিস্তৃত। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও বরলেখা উপজেলার বড় অংশজুড়ে তার দেহ, আর ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় তার রূপ—কখনো জলরাশির আয়না, কখনো সবুজের নকশিকাঁথা। জীববৈচিত্র্য, জলজ সম্পদ আর প্রকৃতির ঋতুভিত্তিক অভিনয়ে হাকালুকি যেন এক জীবন্ত মহাকাব্য।
এই হাওরের পাড়ে পাড়ে ফুটে থাকা বুনো ফুলগুলো সেই মহাকাব্যের কোমলতম পঙ্ক্তি। যত্নহীন মাটির বুক চিরে জন্ম নিয়েও তাদের রঙে আছে দৃঢ়তার দীপ্তি, আর সৌন্দর্যে এক অনাড়ম্বর আত্মমর্যাদা। তারা কারও বাগানের শোভা নয়, কোনো পরিকল্পিত বেষ্টনীর অন্তর্গতও নয়—তবু আপন নিয়মে, আপন ছন্দে তারা ফুটে ওঠে। যেন প্রকৃতি নিজেই নিজের জন্য সাজে, মানুষের প্রশংসা বা স্বীকৃতির অপেক্ষা ছাড়াই।
অযত্ন, অবহেলা কিংবা প্রতিকূলতার ধুলো তাদের ম্লান করতে পারে না; বরং প্রতিটি প্রতিকূলতাই তাদের পাপড়িতে জ্বেলে দেয় আরও উজ্জ্বল আলো। বাতাসে দুলে দুলে তারা বলে যায়—সৌন্দর্য মানেই আয়োজন নয়, টিকে থাকাই এক গভীর শিল্প।
হাকালুকি হাওরের এই বুনো ফুল কেবল চোখের আরাম নয়; তারা এক নীরব পরিবেশ-রক্ষক। পাখির আশ্রয়, পোকামাকড়ের নিবাস, অগণিত ক্ষুদ্র প্রাণের জীবনচক্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে তারা গড়ে তোলে এক সুসম বাস্তুতন্ত্র। তাদের অস্তিত্ব মানেই জীবনের বহুস্বরের সুরেলা সমন্বয়। তাই এই ফুলগুলোকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি জলাভূমিকে সংরক্ষণ নয়—একটি জীবন্ত, শ্বাস-প্রশ্বাসময় পৃথিবীকে আগলে রাখা।
সব মিলিয়ে, হাকালুকি হাওরের বুনো ফুল আমাদের শেখায়—দৃঢ়তা মানে নীরব শক্তি, স্বাভাবিকতাই সবচেয়ে নির্মল সৌন্দর্য, আর আত্মমর্যাদাই প্রকৃত অলংকার। প্রকৃতির এই অনুপম উপহার সংরক্ষণে আমাদের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধই হোক আগামী প্রজন্মের প্রতি গভীরতম অঙ্গীকার।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: