অপ্রতিরোধ্য সিন্ডিকেট :গোয়াইনঘাট সীমান্তে থামছে না চোরাচালান
সিলেটের গোয়াইনঘাট সীমান্তে চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্য যেন কোনোভাবেই থামছে না। প্রতিদিনকার চোরাচালানের চিত্র দেখলে মনে হতে পারে এটি কোনো অবৈধ সীমান্ত নয়, বরং যেন এক বৈধ বাণিজ্যিক হাট। কখনো আইনশৃঙ্খল রক্ষাকারী বাহিনী তথা পুলিশ ও বিজিবি এসব চোরাই মালের ওপর হানা দিচ্ছে, আবার কখনো কোনো কোনো মহলের পরোক্ষ সহযোগিতায় চোরাই মাল নিরাপদে যথাস্থানে পৌঁছে যাচ্ছে। এই সীমান্ত দিয়ে কেবল শুল্ক ফাঁকি দেওয়া ভারতীয় পণ্যই আসছে না, বরং অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপার করা হচ্ছে একাধিক নারী ও পুরুষকে। বিশেষ করে মানবপাচারের শিকার ভুক্তভোগীদের মধ্যে নারীদের সংখ্যাই বেশি। সব মিলিয়ে গোয়াইনঘাট সীমান্তটি বর্তমানে চোরাচালান ও অবৈধ পারাপারের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
সীমান্তের এই বিশাল অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণের পেছনে কাজ করছে সুসংগঠিত পৃথক পৃথক গ্রুপ বা সিন্ডিকেট। প্রতিটি গ্রুপে একজন প্রধান থাকেন, যিনি মূলত মূলধনের জোগানদাতা হিসেবে আড়াল থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। আর মাঠপর্যায়ে থাকে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দক্ষ কর্মীদল, যারা পণ্য রিসিভ করা থেকে শুরু করে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত সব ধরনের ঝুঁকি মোকাবেলা করে। গোয়াইনঘাট সীমান্তে চোরাচালান চক্র পরিচালনায় যাদের নাম বারবার উঠে আসছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন শামস উদ্দিন কালা ওরফে শ্যামকালা, আরিফ ইকবাল ওরফে নেহাল, মাসুক উদ্দিন, আমির উদ্দিন, হযরত আলী ও ইবু সিন্ডিকেট এবং নুরুল শিকদার, জাহিদ ও নাজিম সিন্ডিকেট।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই চোরাচালান সিন্ডিকেটের শিকড় এখন গণমাধ্যমের একাংশের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কোনো চোরাই পণ্য জব্দ হওয়ার পর সাংবাদিক পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি সেই মাল ফেরত আনার জোর প্রচেষ্টা চালান। শুধু তাই নয়, চোরাচালান মামলার আসামিদের নাম পুলিশের চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়ার জন্য মোটা অঙ্কের টাকার ‘কন্ট্রাক্ট’ বা চুক্তি করার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে নামধারী কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ১ জুন ২০২৬ তারিখ রাতে সালুটিকর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের একটি দল গোয়াইনঘাট এলাকায় অবৈধ চোরাচালান ও মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে নামে। রাত আনুমানিক ৮টা ২০ মিনিটের দিকে পুলিশ গোপন সূত্রে জানতে পারে যে, সীমান্ত এলাকা থেকে সরকারি শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ভারতীয় কসমেটিকস ও চকলেটের একটি বড় চালান নিয়ে একটি কাভার্ড ভ্যান (ঢাকা মেট্রো-ন-১৭-০৪৪৭) সিলেটের দিকে রওনা হয়েছে। এই সংবাদের ভিত্তিতে সালুটিকর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক সঞ্জিত চন্দ্র দাসের নেতৃত্বে গোয়াইনঘাট-সালুটিকর সড়কের পূর্ব আঙ্গারজুর এলাকায় দ্রুত একটি অস্থায়ী চেকপোস্ট বসানো হয়। রাত আনুমানিক ৯টা ১০ মিনিটের দিকে সন্দেহভাজন কাভার্ড ভ্যানটি দ্রুত গতিতে চেকপোস্টের কাছে এলে পুলিশ সেটিকে থামার সংকেত দেয়। এ সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে চালকের পাশে থাকা এক ব্যক্তি গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত দৌঁড়ে পালিয়ে যান। তবে পুলিশ ধাওয়া করে কাভার্ড ভ্যানের চালক ইকরামুল হক রানাকে (২০) হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হয়।
পরবর্তীতে কাভার্ড ভ্যানটিতে তল্লাশি চালিয়ে ভেতর থেকে ১৮ বস্তা ভারতীয় বিখ্যাত 'Pringles' ব্যান্ডের চিপস/চকলেট উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, জব্দকৃত প্রতিটি বস্তায় ১৮টি করে মোট ৩২৪টি কার্টুন এবং প্রতি কার্টুনে ১২টি করে পণ্য রয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ধৃত চালক ইকরামুল হক রানা স্বীকার করেন যে, এই বিপুল পরিমাণ জব্দকৃত মালের প্রকৃত মালিক গোয়াইনঘাটের বাঘের খাল গ্রামের মাসুক আহমেদ (৩৫)। ঘটনার সময় পুলিশ দেখে এই মাসুক আহমেদই গাড়ি থেকে নেমে সুকৌশলে পালিয়ে যান।
সালুটিকর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এএসআই মোঃ সিদ্দিক খলিফা জানান, গ্রেফতারকৃত চালক ও পলাতক আসামি দীর্ঘদিন ধরে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে ভারতীয় পণ্য সীমান্ত এলাকা থেকে অবৈধভাবে এনে সিলেটের বিভিন্ন বাজারে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করে আসছিল। এই অভিযানে আরও অংশ নেন এসআই মোঃ শাহাব উদ্দিন খান, কনস্টেবল ইমরান চৌধুরী ও কনস্টেবল রিয়াদ হোসেন। পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় পলাতক আসামিকে গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং ধৃত আসামির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তবে এই সফল অভিযানের ভেতরেও একটি বিতর্কিত গুঞ্জন ডালপালা মেলেছে। জোরালো অভিযোগ উঠেছে যে, অভিযানে আটক এক আসামিকে তিন লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, যার পুরো মধ্যস্থতা করেছেন একটি স্থানীয় অনলাইন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মী। তা ছাড়া মামলার মূল হোতা ও পলাতক আসামি মাসুক উদ্দিনও একইভাবে তার জব্দকৃত মালামাল ফাঁড়ি থেকে খালাস করার জন্য সালুটিকর পুলিশ ফাঁড়িকে বিভিন্নভাবে বারবার চাপ দিচ্ছেন। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট মহলে তদবির ও চাপের এই বিষয়টি মামলার আসামি মাসুক উদ্দিন নিজে মুখে স্বীকারও করেছেন, যা সীমান্তে চোরাচালান সিন্ডিকেটের ক্ষমতার গভীরতাকেই প্রমাণ করে।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: