শহরের অন্ধকার গলিতে বাড়ছে আতঙ্ক
হবিগঞ্জে ড্যান্ডিতে ডুবছে পথশিশুদের জীবন
হবিগঞ্জ শহরের পাড়া-মহল্লা ও জনসমাগমস্থলে বাড়ছে ‘ড্যান্ডি’ আসক্ত পথশিশুর সংখ্যা। সস্তা এবং সহজে পাওয়া যায় বলে ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা এই মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছে। অভাব আর একাকিত্ব ভুলতে গিয়ে তারা মূলত নিজেদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিচ্ছে।
শহরের কালিবাড়ি রোড, টাউন মসজিদের সামনে কিংবা মহিলা কলেজের অন্ধকার গেট—সবখানেই দেখা মেলে এসব নেশাসক্ত শিশুর। ১০ বছরের নূরজাহান বোতল কুড়িয়ে মাসে যা আয় করে, তার পুরোটাই খরচ করে ড্যান্ডির পেছনে। নূরজাহান জানায়, ড্যান্ডি সেবন করলে সে সবকিছু ভুলে থাকে। একই চিত্র দেখা গেছে রফিকুল ও রাকিবের ক্ষেত্রেও। তাদের ভাষ্য, ড্যান্ডি টানলে ক্ষুধা লাগে না এবং মাথায় ঝিমুনি আসে, যা তাদের যন্ত্রণাময় জীবন থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়।
চিকিৎসকদের মতে, ‘ড্যান্ডি’ মূলত জুতা বা হার্ডওয়্যারে ব্যবহৃত এক ধরনের আঠা (ড্যানড্রাইট অ্যাডহেসিভ)। এতে থাকা কার্বন-ট্রাই-ক্লোরাইড, টলুইন ও বেনজিনের মতো রাসায়নিক উপাদানগুলো বাষ্প হয়ে শরীরে প্রবেশ করে এক ধরনের বিভ্রম তৈরি করে।
হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক দেবাশীষ দাশ বলেন, “পথশিশুরা এটি সস্তা বলে বেছে নেয়। এটি সরাসরি শিশুদের মস্তিষ্কে আঘাত করে এবং দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবহারের ফলে গুরুতর মানসিক ও শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি হয়। এটি আবেগকে ভিন্নভাবে পরিবর্তন করে দেয় বলে শিশুরা এতে দ্রুত আসক্ত হয়ে পড়ে।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শহরের হার্ডওয়্যারের দোকান বা মুচির কাছ থেকে পথশিশুরা এই আঠা সংগ্রহ করে। ছোট একটি টিউবের দাম মাত্র ৩৫ টাকা। কৌটায় কিনলে আরও সস্তায় পাওয়া যায়। কিছু অসাধু বিক্রেতা অধিক মুনাফার লোভে শিশুদের কাছে এগুলো বিক্রি করছে। তবে সচেতন ব্যবসায়ীরা এখন সতর্ক হচ্ছেন। তিনকোনা পুকুরপাড় এলাকার হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী নৃপেন্দ্র গোপ জানান, “এখন আমরা অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে এই আঠা বিক্রি করি না। যাচাই-বাছাই করেই কেবল প্রকৃত কারিগরদের কাছে এটি বিক্রি করা হয়।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, প্রচলিত মাদকের তালিকায় ‘ড্যান্ডি’ বা আঠার নাম না থাকায় তারা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। তবে জননিরাপত্তার স্বার্থে খবর পাওয়া মাত্রই তারা শিশুদের সরিয়ে দেওয়া বা সতর্ক করার কাজ করছেন।
সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা মনে করেন, কেবল অভিযান চালিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এসব পথশিশুদের পুনর্বাসন এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করলে হবিগঞ্জ শহরের সামাজিক পরিবেশ আরও বিষিয়ে উঠতে পারে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: